একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট পুনরুদ্ধার ও পরিশোধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিল এলাকার সেনা কল্যাণ ভবনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিক। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে একীভূত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বিক্ষোভ করেন, যেখানে তারা দ্রুত অর্থ ফেরতের দাবি জানান।
ধাপে ধাপে উত্তোলনের কাঠামো
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকরা শুরুতেই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন। এরপর নির্ধারিত সময় পরপর ধাপে ধাপে আরও অর্থ তোলার সুযোগ থাকবে, এবং সর্বোচ্চ একুশ মাসের মধ্যে পুরো অর্থ উত্তোলন করা যাবে।
প্রাথমিক ধাপে একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। এরপর প্রতি তিন মাস পরপর এক লাখ টাকা করে উত্তোলনের সুযোগ থাকবে। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে পুরো আমানত ফেরত দেওয়া হবে।
আমানতের ধরনভিত্তিক ব্যবস্থা
শুধু চলতি বা সঞ্চয় হিসাব নয়, নির্দিষ্ট মেয়াদি জমা প্রকল্প এবং মাসিক সঞ্চয় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মেয়াদ পূর্ণ হলে প্রথম ধাপে এক লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হবে। বাকি অর্থ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নবায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে।
প্রতিবার নবায়নের সময় গ্রাহকরা তাদের অর্জিত মুনাফা উত্তোলন করতে পারবেন, তবে মূল অর্থ ধাপে ধাপে নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী সংরক্ষিত থাকবে।
বিশেষ সুবিধা ও জরুরি উত্তোলন
গুরুতর অসুস্থ বা জটিল রোগে আক্রান্ত আমানতকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। কিডনি রোগীসহ দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরা প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য সীমাহীন অর্থ উত্তোলনের আবেদন করতে পারবেন, তবে এজন্য চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রশাসক সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুমোদন দিতে পারবেন। এর বেশি অর্থের প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ অনুমোদনের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করা হবে।
ধাপে উত্তোলনের সারসংক্ষেপ
| ধাপ |
সময়সীমা |
উত্তোলনের পরিমাণ |
বিশেষ শর্ত |
| প্রথম ধাপ |
শুরুতেই |
সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা |
সকল আমানতকারী |
| দ্বিতীয় ধাপ |
প্রতি ৩ মাস পর |
১ লাখ টাকা করে |
ধারাবাহিক উত্তোলন |
| তৃতীয় ধাপ |
২১ মাস পর্যন্ত |
ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ অর্থ |
নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী |
| বিশেষ সুবিধা |
প্রয়োজন অনুযায়ী |
সীমাহীন বা ১০ লাখ পর্যন্ত |
চিকিৎসা ও জরুরি পরিস্থিতি |
প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সংস্কার
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র জানান, একীভূত ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সংস্কার চলছে। একই এলাকার একাধিক শাখা একীভূত করে একটি কার্যকর শাখায় রূপান্তর করা হবে, যাতে পরিচালন ব্যয় কমে এবং দক্ষতা বাড়ে।
একইভাবে বিভিন্ন ব্যাংকের পৃথক প্রধান কার্যালয় পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা হবে। যেসব কার্যালয় ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হচ্ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত একীকরণ
পাঁচটি ব্যাংকে বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ব্যবস্থাকে একীভূত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সকল কার্যক্রম একক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হতে পারে।
নতুন নেতৃত্ব গঠন প্রক্রিয়া
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে। শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে এবং যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্ব নির্ধারণের কাজও এগিয়ে চলছে।
সরকারের লক্ষ্য
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, সরকারের লক্ষ্য হলো একীভূত ব্যাংককে একটি স্থিতিশীল, লাভজনক এবং টেকসই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। এজন্য প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত সব ধরনের সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।