চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও ২০২৫ সালে সিটি ব্যাংক পিএলসি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ আর্থিক সাফল্য অর্জন করেছে। ব্যাংকটি সমন্বিত নিট মুনাফা হিসেবে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১০ কোটি টাকা বা প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি। এই অর্জন ব্যাংকটির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নীতির কার্যকারিতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকের একক নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি ব্যাংকের চারটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ১৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা যুক্ত হয়েছে, যা সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ব্যাংকের এই রেকর্ড প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ঋণ থেকে সুদ আয় বৃদ্ধি, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগ কৌশলের কার্যকর বাস্তবায়নকে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের সুদ আয় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক চাপ ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মধ্যেও সিটি ব্যাংক আমানতের খরচ ৫.৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটি সরকারি সিকিউরিটিজে কৌশলগত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে তহবিল ব্যয়ের চাপ সামাল দিয়েছে। ফলে মোট ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার পরিচালন আয়ের মধ্যে বিনিয়োগ খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশে। নিট বিনিয়োগ আয় হয়েছে ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকের ফি ও কমিশন আয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে সিটি ব্যাংক দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৮.০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ট্রেড ব্যবসা সম্পন্ন করেছে। এর মাধ্যমে ট্রেড সার্ভিস থেকে আয় হয়েছে ৫২৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি রিটেইল ব্যাংকিং ও কার্ড ব্যবসা থেকে এসেছে ৪৭১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ফি ও কমিশন আয় দাঁড়িয়েছে ৯৯৭ কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন আয়ের প্রায় ২১ শতাংশ।
ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও ব্যাংকটি ব্যয়-আয় অনুপাত ৪৪ শতাংশে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মোট আয় ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের কার্যকর অপারেশনাল ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।
তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে প্রভিশন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ৮১৫ কোটি টাকা প্রভিশন ব্যয় করেছে, যা আগের বছর ছিল ৬২৮ কোটি টাকা। এর ফলে প্রভিশন কভারেজ অনুপাত বেড়ে ১২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি ইতিবাচক দিক।
নিচে সিটি ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রধান আর্থিক সূচকগুলোর একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| সূচক |
২০২৫ সালের অবস্থা |
আগের বছরের তুলনা |
| সমন্বিত নিট মুনাফা |
১,৩২৪ কোটি টাকা |
+৩১% বৃদ্ধি |
| একক নিট মুনাফা |
১,৩০৬ কোটি টাকা |
বৃদ্ধি পেয়েছে |
| সুদ আয় |
৫,৪৫২ কোটি টাকা |
৪,৪০৩ কোটি টাকা |
| মোট পরিচালন আয় |
৪,৮৮৮ কোটি টাকা |
বৃদ্ধি পেয়েছে |
| ফি ও কমিশন আয় |
৯৯৭ কোটি টাকা |
২১% অবদান |
| প্রভিশন ব্যয় |
৮১৫ কোটি টাকা |
৬২৮ কোটি টাকা |
| ব্যয়-আয় অনুপাত |
৪৪% |
স্থিতিশীল |
| এনপিএল হার |
২.৫% |
৩.৭% থেকে কমেছে |
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন এই অর্জনকে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, উচ্চ প্রভিশন ব্যয়ের কারণে মুনাফা ১,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে না পারলেও ব্যাংকের মূল ব্যবসা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, রিটেইল ব্যাংকিং ও কার্ড ব্যবসা বর্তমানে কর্পোরেট ব্যাংকিংয়ের চেয়েও বেশি আয় করছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। পাশাপাশি ছোট ব্যবসা, ন্যানো ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড পোর্টফোলিওর গুণগত মানও সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালে সিটি ব্যাংকের এই রেকর্ড মুনাফা দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও আয় বৃদ্ধি, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যয় দক্ষতার সমন্বয়ে ব্যাংকটি যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।