গত ১৩ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত বৈশ্বিক বীমা ও পুনর্বীমা খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়েছে। একদিকে এশিয়া ও ভারতে পুনর্বীমার (Reinsurance) প্রিমিয়াম হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে ঝুঁকি ও পরিচালনাগত চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর সেবা এবং নতুন লিগ্যাসি পণ্য চালুর মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলো বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।
এশিয়ায় পুনর্বীমা বাজারে দরপতন
১ এপ্রিলের নবায়ন মৌসুমে এশিয়া ও ভারতে পুনর্বীমা প্রিমিয়াম হ্রাসের একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে। বৈশ্বিক ব্রোকার প্রতিষ্ঠান গাই কার্পেন্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে মূলধনের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত সক্ষমতা (excess capacity) তৈরি হয়েছে, যা প্রিমিয়াম কমার প্রধান কারণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নবায়ন সময়ে এশিয়ায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পুনর্বীমা প্রিমিয়াম এবং ভারতের সব পুনর্বীমা চুক্তি নবায়নের আওতায় ছিল। অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা এবং ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বীমা কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম দামে চুক্তি নবায়ন করতে পেরেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় ঝুঁকি বৃদ্ধি
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক বীমা খাতে নতুন করে ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ট্রেড ক্রেডিট ইনস্যুরেন্স (বাণিজ্য ঋণ বীমা) এবং ঝুঁকি মূল্যায়নে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অ্যালিয়ানজ ট্রেড গ্লোবাল সার্ভের তথ্যে দেখা গেছে, ১৩টি বাজারে ৬,০০০ কোম্পানির ওপর জরিপ চালিয়ে পাওয়া ফলাফলে ৭৫ শতাংশ রপ্তানিকারক ২০২৬ সালে ইতিবাচক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির আশা প্রকাশ করেছে। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এয়ারলাইন্স খাতে চাপ বৃদ্ধি
বৈশ্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইওনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এশিয়ার এয়ারলাইন্স খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ফ্লাইট পরিচালনা, বিমা কাভারেজ এবং ব্যয় কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই জটিলতা বাড়ছে।
এইওনের এশিয়া অঞ্চলের মেরিন ও এভিয়েশন প্রধান স্টিফেন রাডম্যান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি ঝুঁকি পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে ফ্লাইট রুট পরিবর্তন, নিরাপত্তা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিমা প্রিমিয়াম পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
লিগ্যাসি পরিকল্পনায় ঘাটতি
একই সময়ে সম্পদ হস্তান্তর ও লিগ্যাসি পরিকল্পনা নিয়ে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৮১ শতাংশ মানুষ আশঙ্কা করছেন যে তাদের সম্পদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত নাও থাকতে পারে। অথচ মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যক্তি এ বিষয়ে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছেন।
নিচে লিগ্যাসি পরিকল্পনার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো—
| সূচক |
শতাংশ |
| সম্পদ সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বিগ্ন |
৮১% |
| সম্পূর্ণ প্রস্তুত |
১৮% |
| পরিকল্পনা সম্পন্ন ও শেয়ার করেছেন |
৬% |
| কোনো পরিকল্পনা নেই |
২৫% |
এই প্রেক্ষাপটে কানাডাভিত্তিক সান লাইফ (ফিলিপাইনস) “সান লাইফ প্রিমিয়ার লিগ্যাসি” নামে একটি নতুন পণ্য চালু করেছে, যা সম্পদ হস্তান্তর ও ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি।
এআই নির্ভর সেবার বিস্তার
চীনের পিং আন ইন্স্যুরেন্স তাদের “সার্ভিস ইয়ার ২০২৬” কর্মসূচির অংশ হিসেবে এআই-চালিত এক্সপ্রেস সার্ভিস এবং গ্লোবাল ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স সেবায় বড় ধরনের উন্নয়ন ঘোষণা করেছে।
এই নতুন সেবার মাধ্যমে গ্রাহকরা একটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে লেনদেন, অর্থায়ন, দাবি নিষ্পত্তি এবং জরুরি সহায়তা নিতে পারবেন। এর ফলে সেবা প্রক্রিয়া সহজতর এবং দ্রুততর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্পোরেট সম্প্রসারণ
এদিকে, ক্রেডিট আগ্রিকোল গ্রুপের জাপান শাখা—ক্রেডিট আগ্রিকোল সিআইবি এবং লাইফ ইন্স্যুরেন্স ইউনিট—টোকিওর আজাবুদাই হিলস মরি জেপি টাওয়ারে নতুন অফিস উদ্বোধন করেছে। আধুনিক ও শক্তি-সাশ্রয়ী এই অফিসে ৩৫০ জনের বেশি কর্মী একত্রে কাজ করবেন।
সার্বিক মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক বীমা খাতে একদিকে যেমন প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। পুনর্বীমা বাজারে দরপতন স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বীমা খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।