গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় মোবাইল ফোন ব্যবহার ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দাওরায়ে হাদিস বিভাগের ১৭ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় মাদরাসা অঙ্গনে যেমন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বনাম মানবিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রোববার (১৯ এপ্রিল) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা জাকির হোসেন। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের নীতিমালা অনুযায়ী কওমি মাদরাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। তবে সংশ্লিষ্ট ১৭ জন শিক্ষার্থী এই নিয়ম অমান্য করে গোপনে মোবাইল ব্যবহার করছিলেন।
মাদরাসা সূত্রে জানা যায়, শুধু মোবাইল ব্যবহারের অভিযোগই নয়, বরং আরও গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) ক্লাস শুরুর আগে ওই শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে তালা লাগিয়ে চলে যান বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। বিষয়টি শিক্ষক ও প্রশাসনের নজরে আসার পর তা গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরবর্তীতে মাদরাসার শিক্ষকমণ্ডলীর এক যৌথ বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে।
মাদরাসার সহকারী শিক্ষক মাওলানা শফী কাসেমী নদভী তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরে লেখেন, এটি কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তিনি উল্লেখ করেন, সকল শিক্ষকের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সবাই এতে একমত ছিলেন।
প্রধান শিক্ষক মাওলানা জাকির হোসেন বলেন, দাওরায়ে হাদিস বিভাগের ওই ১৭ শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল আসক্তিতে ভুগছিলেন। একাধিকবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা নিয়ম ভঙ্গ অব্যাহত রাখে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে তালা লাগানোর মতো আচরণকে তিনি গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না।”
এদিকে এই বহিষ্কারাদেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ গ্রিন পার্টি নামে একটি সংগঠন। রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।
সংগঠনটি মনে করে, গণবহিষ্কারের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যেত। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের সাময়িকভাবে সতর্ক করা বা স্থগিত রেখে পুনর্বাসনের সুযোগ দিলে তারা সংশোধনের সুযোগ পেত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শিক্ষার্থীদের অনুতাপ প্রকাশের সুযোগ দিয়ে পুনরায় শিক্ষাজীবনে ফেরার পথ তৈরি করা হলে তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা পেত এবং প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ভাবমূর্তিও অক্ষুণ্ণ থাকত।
ঘটনাটির সারসংক্ষেপ
| বিষয় |
তথ্য |
| প্রতিষ্ঠান |
জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা, টঙ্গী |
| বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী |
১৭ জন (দাওরায়ে হাদিস) |
| অভিযোগ |
মোবাইল ব্যবহার ও শৃঙ্খলাভঙ্গ |
| গুরুতর ঘটনা |
শ্রেণিকক্ষে তালা লাগানো |
| সিদ্ধান্ত |
শিক্ষকদের সম্মিলিত বহিষ্কার |
| তারিখ |
১৬ এপ্রিল (ঘটনা), ১৯ এপ্রিল (ঘোষণা) |
| প্রতিক্রিয়া |
সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগ |
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের যুগে মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে কঠোর শাস্তির পাশাপাশি কাউন্সেলিং, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আচরণগত শিক্ষা আরও কার্যকর হতে পারে। তাদের মতে, শৃঙ্খলা রক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব।