খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (আরএনপিপি) এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্বারপ্রান্তে। নির্মাণকাজের সময়সীমা কয়েক দফা পরিবর্তিত হলেও সম্প্রতি প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটে ‘ফুয়েল লোডিং’ বা পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করেছে। এই লাইসেন্স প্রাপ্তির মাধ্যমে কেন্দ্রটি চালুর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করল।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের শেষভাগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ঐতিহাসিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যোগদানের সম্ভাবনা রয়েছে। ফুয়েল লোডিং মূলত একটি পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি দণ্ড বা অ্যাসেম্বলিগুলো স্থাপন করার প্রক্রিয়া, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এখান থেকে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। এরপর শুরু হয় ‘পাইলট অপারেশন’ বা পরীক্ষামূলক উৎপাদন। এই পর্যায়ে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয় এবং বিভিন্ন কারিগরি দিক যেমন সিনক্রোনাইজেশন, টারবাইন জেনারেটরের কার্যকারিতা এবং জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন (সিওডি) শুরু হতে ৬ থেকে ১২ মাস সময় লাগতে পারে। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে চুল্লিটি তার মোট ক্ষমতার ৯০ শতাংশ সক্ষমতায় টানা ১৮ মাস নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারবে। এরপর জ্বালানি পরিবর্তন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট বিরতি নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি তা জাতীয় গ্রিডে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন নির্মাণ একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় চারটি সঞ্চালন লাইনের কাজ গত বছরের মে মাসেই সম্পন্ন হয়েছে। ভারতের তিনটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এই লাইনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত বাকি সঞ্চালন লাইনগুলোর কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র:
| বৈশিষ্ট্য | তথ্য |
| প্রকল্পের অবস্থান | রূপপুর, ঈশ্বরদী, পাবনা |
| মোট উৎপাদন ক্ষমতা | ২,৪০০ মেগাওয়াট (প্রতিটি ইউনিট ১,২০০ মেগাওয়াট) |
| প্রযুক্তিগত সহায়তা | রাশিয়া (রোসাটম) |
| রিঅ্যাক্টর টাইপ | ভিভিইআর-১২০০ (جيل ৩+) |
| আনুমানিক প্রকল্প ব্যয় | প্রায় ১,১৩,০০০ কোটি টাকা |
| জ্বালানি প্রাপ্তি | ২০২৩ সালের অক্টোবর (প্রথম চালান) |
| প্রথম ইউনিটের গ্রিড সংযোগ লক্ষ্যমাত্রা | ডিসেম্বর ২০২৬ |
| বর্তমান স্থিতি | ফুয়েল লোডিং কমিশনিং লাইসেন্স প্রাপ্ত |
নিউক্লিয়ার ফিশন বা পরমাণু বিভাজন প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় তদারকি এবং জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা ‘ইভাকুয়েশন প্ল্যান’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন। পরমাণু শক্তি কমিশনের দাবি, সব ধরনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই কেন্দ্রটি পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি ত্রুটিমুক্ত অপারেশন নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে প্রধান সহায়ক হয়ে উঠবে।