খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 12শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৫ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত জামিল আহমেদ লিমন এবং নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল এবং তাঁরা অচিরেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে ঘাতকের নির্মমতায় তাঁদের সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। প্রায় ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই দিনে বৃষ্টির মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করা হয়। লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বোনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন, যা পরবর্তীতে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষও পরিবারকে জানায়।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আবুঘরবেহ নিহত লিমনের রুমমেট ছিলেন এবং তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় আবুঘরবেহ একটি বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে সোয়াত (SWAT) দল এবং বিশেষ সংকট নিরসন দলকে তলব করতে হয়। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
শারীরিকভাবে আঘাত ও মারধর।
জোরপূর্বক আটকে রাখা।
প্রমাণ নষ্টের অপচেষ্টা।
মৃত্যুর ঘটনা গোপন রাখা।
মৃতদেহ অবৈধভাবে স্থানান্তর।
জামিল আহমেদ লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদের ভাষ্যমতে, লিমন ও বৃষ্টি একে অপরকে ভালোবাসতেন। লিমন তাঁর থিসিস নিয়ে গত দুই বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন। অত্যন্ত নম্র ও হাস্যোজ্জ্বল লিমন পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি বৃষ্টি সম্পর্কে পরিবারকে জানিয়েছিলেন যে, বৃষ্টি অত্যন্ত মেধাবী, সুকণ্ঠী গায়িকা এবং রন্ধনকলায় পারদর্শী। তাঁদের এই সুন্দর আগামীর পরিকল্পনা ঘাতকের হাতে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল।
নিচে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের তথ্য ও ঘটনার সময়রেখা একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহত ১ (শিক্ষার্থী) | জামিল আহমেদ লিমন (২৭), পিএইচডি গবেষক (ইউএসএফ) |
| নিহত ২ (শিক্ষার্থী) | নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি, পিএইচডি গবেষক (ইউএসএফ) |
| প্রধান অভিযুক্ত | হিশাম আবুঘরবেহ (২৬), প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও লিমনের রুমমেট |
| নিখোঁজের তারিখ | ১৬ এপ্রিল, ২০২৪ |
| সর্বশেষ অবস্থান | লিমন (ছাত্রাবাস, সকাল ৯টা), বৃষ্টি (এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিল্ডিং, সকাল ১০টা) |
| নিখোঁজ ডায়েরি | ১৭ এপ্রিল, ২০২৪ (পারিবারিক বন্ধুর মাধ্যমে) |
| মরদেহ উদ্ধার | ২৫ এপ্রিল, ২০২৪ (শুক্রবার) |
| অভিযুক্তের পূর্ব রেকর্ড | ২০২৩ সালে দুইবার মারধরের অভিযোগে গ্রেপ্তার এবং পারিবারিক সহিংসতার ইনজাংশন |
আদালতের নথি থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত হিশাম আবুঘরবেহ আগে থেকেই সহিংস আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন। ২০২৩ সালে নিজের মা ও ভাইয়ের ওপর আক্রমণের দায়ে তিনি দুইবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁর ভাই আদালত থেকে একটি নিষেধাজ্ঞা (Injunction) নিয়েছিলেন যাতে তিনি বাড়িতে প্রবেশ করতে না পারেন। তবে গত বছরের মে মাসে সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং আদালত পুনরায় তা বর্ধিত না করায় তিনি আবারও পরিবারের সাথে এবং পরবর্তীতে লিমনের রুমমেট হিসেবে থাকার সুযোগ পান।
শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার এই ঘটনাকে ‘ভয়ানক ও উদ্বেগজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চিফ ডেপুটি জোসেফ মাউরার জানিয়েছেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা লিমনের মরদেহের সাথে সন্দেহভাজনের সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন। যদিও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় আবুঘরবেহ সহযোগিতা করেছিলেন, তবে পরবর্তী পর্যায়ে তিনি নীরবতা অবলম্বন করেন। বর্তমানে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে মার্কিন প্রশাসন নিবিড়ভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।