খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশে ক্যাশলেস সোসাইটি বা নগদ অর্থবিহীন সমাজ গঠনের লক্ষে বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ‘নেক্সাস পে’ একটি শক্তিশালী মাইলফলক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অত্যন্ত নিরবে ও সুশৃঙ্খলভাবে ব্যাংকটির এই ডিজিটাল সেবাটি বর্তমানে প্রায় এক কোটি গ্রাহকের কাছে পৌঁছে গেছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নিজস্ব গ্রাহক এবং তাদের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রকেট’-এর ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি অন্যান্য ব্যাংকের গ্রাহকেরাও বর্তমানে এই অ্যাপটি ব্যবহার করছেন। এর ফলে নেক্সাস পে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় একটি সর্বজনীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করার পর থেকে নেক্সাস পে ক্রমাগত নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে। শুরুর দিকে এটি সীমিত পরিসরে চালু হলেও সময়ের সাথে সাথে এতে যুক্ত হয়েছে আধুনিক সব ফিচার। ডাচ-বাংলা ব্যাংক সূত্র অনুসারে, ২০২৫ সাল নাগাদ এর মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০ লাখ ৪৩ হাজারে, যার বড় একটি অংশ ব্যাংকটির নিজস্ব হিসাবধারী। তবে রকেট ব্যবহারকারী এবং অন্যান্য ব্যাংকের ভিসা ও মাস্টারকার্ড গ্রাহকদের মধ্যেও অ্যাপটির জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) গ্রাহক সংখ্যা আরও ৪ লাখ ৭ হাজার বৃদ্ধি পেয়ে মার্চ শেষে মোট সংখ্যা ৯৪ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
নিচে নেক্সাস পে অ্যাপের গ্রাহক বৃদ্ধির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: বছরভিত্তিক নেক্সাস পে গ্রাহক বিশ্লেষণ
| গ্রাহকের ধরন | ২০২৩ সাল | ২০২৫ সাল | ২০২৬ (মার্চ পর্যন্ত) |
| ডাচ্-বাংলা ব্যাংক গ্রাহক | ৫৭,২৩,০০০ | ৮০,৮৪,০০০ | – |
| রকেট (Mobile Banking) | ৪,৫৯,০০০ | ৮,১৭,০০০ | – |
| অন্যান্য ব্যাংক গ্রাহক | ৯৯,০০০ | ১,৪১,০০০ | – |
| মোট গ্রাহক সংখ্যা | ৬২,৮১,০০০ | ৯০,৪৩,০০০ | ৯৪,৫০,০০০ |
কেবল গ্রাহক সংখ্যাই নয়, আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও নেক্সাস পে অভাবনীয় সাফল্য প্রদর্শন করেছে। ২০২৩ সালে যেখানে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৮,৫১৫ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক অর্থাৎ প্রথম তিন মাসেই অ্যাপটির মাধ্যমে ৬২,৭১১ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহতেশামুল হক খান জানিয়েছেন, বর্তমানে অ্যাপটির মাধ্যমে প্রতি মাসে গড়ে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে।
লেনদেনের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অর্থ আদান-প্রদান হচ্ছে ব্যাংকটির এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তরের (Internal Fund Transfer) মাধ্যমে। ২০২৫ সালে এই খাতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এছাড়া পরিষেবা বিল বা ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ৪,১৯১ কোটি টাকা এবং কিউআর কোড ব্যবহার করে কেনাকাটায় ৮১৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। মোবাইল রিচার্জের ক্ষেত্রেও এই অ্যাপের ব্যবহার বাড়ছে, যার পরিমাণ ২০২৫ সালে ছিল ১৯১ কোটি টাকা।
নেক্সাস পে অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি বড় বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে লিঙ্গভেদে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ব্যবহারকারীর ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং মাত্র ১৬ শতাংশ নারী। তবে দেশজুড়ে এই অ্যাপের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হচ্ছে এর বিশাল মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার দোকানে কিউআর কোড ব্যবহার করে পেমেন্ট করার সুবিধা রয়েছে। এর ফলে গ্রাহকদের লেনদেনের সংখ্যাও বাড়ছে। ২০২৩ সালে যেখানে লেনদেনের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি, ২০২৫ সালে তা দ্বিগুণ হয়ে ৮ কোটিতে পৌঁছেছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এই সুবিধা গ্রহণ করতে গ্রাহককে স্মার্টফোনের অ্যাপ স্টোর থেকে অফিশিয়াল নেক্সাস পে অ্যাপটি সংগ্রহ করতে হয়। নিবন্ধনের জন্য সচল মোবাইল নম্বর, ওটিপি (One Time Password) এবং ৬ ডিজিটের গোপন পিন ব্যবহার করতে হয়। সফল নিবন্ধনের পর ব্যবহারকারী তার ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড বা রকেট অ্যাকাউন্টটি অ্যাপে যুক্ত করতে পারেন। এর মাধ্যমে গ্রাহক ঘরে বসেই ব্যালেন্স চেক, ফান্ড ট্রান্সফার, বিল পেমেন্ট এবং শপিংয়ের মতো প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে পারছেন।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের লক্ষ্য হলো নেক্সাস পে-কে গ্রাহকের আর্থিক লেনদেনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা, যাতে সাধারণ ব্যাংকিং সেবার জন্য গ্রাহককে আর সশরীরে ব্যাংকের শাখায় উপস্থিত হতে না হয়। প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের বাইরেও এতে রয়েছে ‘লয়্যালটি পয়েন্টস কার্ড’ তৈরির সুবিধা, যা ডিজিটাল পেমেন্টকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর আধুনিকায়নে নেক্সাস পে একটি প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।