খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৮ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিদেশে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার এক দম্পতিকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুরে মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এর বিচারক আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এই আদেশ প্রদান করেন। অভিযুক্তরা প্রতিবেশী দুই ব্যক্তিকে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর নাম করে মোট ৩২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে মামলার নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে কারাগারে প্রেরিত অভিযুক্তরা হলেন মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার চালা ইউনিয়নের ষট্টি গ্রামের সালাম মুল্লার ছেলে মো. জহিরুল ইসলাম এবং তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম। মামলার বিবরণে জানা যায়, জহিরুল ও মনোয়ারা দম্পতি তাঁদের প্রতিবেশী বাদল বিশ্বাস ও মো. দেলোয়ার হোসেনকে উচ্চ বেতনে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখান। উন্নত জীবনের আশায় ভুক্তভোগীরা আসামিদের প্রস্তাবে বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং জমিজমা বিক্রি করে বিভিন্ন সময়ে নগদ মোট ৩২ লাখ টাকা তাঁদের হাতে তুলে দেন।
দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীদের বিদেশে পাঠাতে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীরা তাঁদের দেওয়া পাসপোর্ট ও অর্থ ফেরত চাইলে জহিরুল ও মনোয়ারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। অভিযোগ রয়েছে, টাকা ফেরত চাওয়ায় আসামিরা ভুক্তভোগীদের প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করেন এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করার জন্য বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন।
প্রতারণার শিকার অলিদ বিশ্বাস মামলার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে জানান যে, সরল বিশ্বাসে তিনি, তাঁর পিতা বাদল বিশ্বাস এবং চাচা দেলোয়ার হোসেন পৈত্রিক জমিজমা ও সহায়-সম্বল বিক্রি করে এই ৩২ লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন। আসামিরা তাঁদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত চরম প্রতারণায় পর্যবসিত হয়েছে। অর্থ এবং সম্পদ হারিয়ে বর্তমানে ভুক্তভোগী পরিবারটি নিঃস্ব অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর যখন তাঁরা বুঝতে পারেন যে বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি একটি সাজানো প্রতারণা ছিল, তখন তাঁরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সহায়তা নিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
ভুক্তভোগীরা প্রথমে হরিরামপুর থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে পুলিশ তাঁদের বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে সুরাহা করার পরামর্শ দেয়। সেই প্রেক্ষিতে মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এ একটি সিআর (CR) মামলা দায়ের করা হয়। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে আদালত এর তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর ওপর ন্যস্ত করেন।
পিবিআই-এর তদন্তকারী কর্মকর্তারা দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্ত শেষে মামলার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা খুঁজে পান এবং আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। পিবিআই-এর প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিচারক অভিযুক্ত জহিরুল ইসলাম ও মনোয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরোয়ানা জারির পর থেকে আসামিরা আত্মগোপনে থাকলেও সোমবার (২৭ এপ্রিল) তাঁরা মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এ উপস্থিত হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মসমর্পণের আবেদন করেন এবং জামিন প্রার্থনা করেন।
আদালতের বিচারক উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আসামিদের জামিন আবেদন নাকচ করে দেন। পিবিআই-এর দাখিলকৃত প্রতিবেদনে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকায় বিচারক আসামিদের সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন। আদালতের এই আদেশে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁরা যেন তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ দ্রুত ফেরত পান। একই সঙ্গে তাঁরা এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন যেন ভবিষ্যতে কোনো প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বা আর্থিক আবেগকে পুঁজি করে বিদেশে পাঠানোর নামে এমন জঘন্য প্রতারণা করার সাহস না পায়।
মানিকগঞ্জ জেলা আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমানে আসামিরা মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে রয়েছেন এবং মামলার পরবর্তী কার্যক্রম আইন অনুযায়ী চলমান থাকবে। অভিবাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের দ্রুত আইনি পদক্ষেপ বিদেশে গমনেচ্ছু সাধারণ মানুষকে প্রতারক চক্রের হাত থেকে সুরক্ষা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।