খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যে সব বৃহৎ ভৌত অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটির সঙ্গেই নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে এক আলোকিত নাম—জামিলুর রেজা চৌধুরী। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সেতুর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাঁর অবদান জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। একইসঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও—যা তাঁর প্রজ্ঞা ও গ্রহণযোগ্যতারই স্বীকৃতি।
১৯৪৩ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব-কৈশোরে সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল ও ঢাকা কলেজে অধ্যয়ন শেষে ভর্তি হন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বুয়েট)। ১৯৬৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জনের পরপরই একই বছরের নভেম্বরে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘদিন বুয়েটে অধ্যাপনা করে তিনি দেশের প্রকৌশল শিক্ষায় এক অনন্য উচ্চতা এনে দেন।
তিনি শুধু শিক্ষকই নন—ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান সংগঠকও। বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। এছাড়াও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব ছিল প্রশংসিত।
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর দক্ষতার স্বীকৃতি এসেছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। কিংবদন্তি প্রকৌশলী এফ আর খানের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ পেয়েও তিনি দেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন—দেশগঠনের স্বপ্নে।
দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে তাঁর ৬৯টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট স্বর্ণপদক এবং ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৭ সালে তিনি লাভ করেন একুশে পদক। পরের বছর, ২০১৮ সালের ১৯ জুন, তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে ভূষিত করা হয়—যা তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি।
২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল এই মহৎ প্রাণের প্রস্থান ঘটে। কিন্তু তাঁর কাজ, চিন্তা ও অবদান চিরকাল বেঁচে থাকবে এই দেশের অগ্রযাত্রায়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি সেই প্রজ্ঞাবান মানুষটিকে, যিনি নীরবে গড়ে দিয়েছেন এক আধুনিক বাংলাদেশ।