এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
“কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই”—এই একটি গানই যেন যথেষ্ট, এক অনন্য কণ্ঠের জাদুতে হারিয়ে যেতে। গানটি বাজলেই যাঁর মুখটি অমলিনভাবে ভেসে ওঠে, তিনি আমাদের সবার প্রিয় মান্না দে।
প্রবোধ চন্দ্র দে—এই নামটি হয়তো আনুষ্ঠানিক, কিন্তু ‘মান্না দে’ নামেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনিবার্য অনুভূতি। ১৯১৯ সালের ১ মে, কলকাতার বুকে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী কণ্ঠ দিয়ে জয় করেছিলেন গোটা উপমহাদেশের হৃদয়।
বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি—ভাষা তাঁর কাছে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং প্রতিটি ভাষায় তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন সুরের আবেগ, আর সেই আবেগেই গড়ে উঠেছে তাঁর অমরত্ব। তাঁর গান মানেই এক অন্য জগৎ—ভালোবাসা, বেদনা আর স্মৃতির মায়াজালে বোনা এক চিরন্তন ভুবন।
“জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমিতো নই”, “এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি”, “যদি কাগজে লেখো নাম”, “খুব জানতে ইচ্ছে করে”, কিংবা “ক’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ”—এসব গান শুধু সুর নয়, মানুষের মনের গভীরতম অনুভূতির প্রতিধ্বনি।
বিশেষ করে কফি হাউসের সেই আড্ডাটা—এই গান যেন এক প্রজন্মের স্মৃতির ডায়েরি। গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার এবং সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ-এর সৃষ্ট এই গানটি মান্না দে’র কণ্ঠে পেয়েছিল অনন্ত জীবনের ছোঁয়া।
শিল্পী জীবনের শুরুতেই তিনি পেয়েছিলেন এক অসাধারণ দীক্ষা। তাঁর কাকা, সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে-এর সান্নিধ্যে বড় হয়ে ওঠা মান্না দে শিখেছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা। সরগম আর রাগ-রাগিণীর কঠোর অনুশীলনই ছিল তাঁর সাফল্যের ভিত্তি।
১৯৪৩ সালে তামান্না চলচ্চিত্রে গান গেয়ে শুরু হয় তাঁর পথচলা। এরপর প্রায় সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান—যার প্রতিটি যেন এক একটি জীবন্ত গল্প।
ষাট বছরেরও বেশি সময়জুড়ে সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা—পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণ এবং দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। পাশাপাশি রবীন্দ্রভারতী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও লাভ করেন ডি-লিট সম্মাননা।
ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন অনন্য। ১৯৫৩ সালে কেরালার সুলোচনা কুমারনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ—যাঁকে তিনি স্নেহ করে ডাকতেন ‘সলু’। তাঁর নিজের কথায়, “আমার প্রেমের গানগুলো আমি সুলুকেই ভেবে গেয়েছি।” এই ভালোবাসাই যেন তাঁর কণ্ঠে এনে দিয়েছিল অতুলনীয় আবেগ।
২০১২ সালে সুলোচনার প্রয়াণের পর, মান্না দে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর, ব্যাঙ্গালোরে তিনি পাড়ি জমান অনন্তের পথে—হয়তো আবার মিলিত হতে তাঁর প্রিয় সুলুর সঙ্গে।
মান্না দে শুধু একজন শিল্পী নন—তিনি এক অনুভব, এক যুগ, এক স্মৃতির নাম।
তাঁর গান থাকবে, তাঁর কণ্ঠ বেঁচে থাকবে—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।ল