খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
ইয়েমেনের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের নিকটবর্তী আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় একটি তেলবাহী ট্যাংকার সশস্ত্র ব্যক্তিদের দ্বারা ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে। ইয়েমেনি কোস্টগার্ড এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, অজ্ঞাতনামা একদল সশস্ত্র ব্যক্তি জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটির গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এই ঘটনার পর লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ইয়েমেনের কোস্টগার্ড জানিয়েছে, লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার এবং ইয়েমেনের শাবওয়া প্রদেশ সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় এই ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটে। ‘এম/টি ইউরেকা’ (M/T Eureka) নামক ট্যাংকারটিতে একদল সশস্ত্র বন্দুকধারী অতর্কিতে উঠে পড়ে এবং ক্রুদের জিম্মি করে জাহাজটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, জাহাজটিকে এডেন উপসাগর হয়ে সোমালিয়ার জলসীমার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে প্রবল ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত সোমালি জলদস্যুরা জাহাজ ছিনতাইয়ের পর এই রুটটি ব্যবহার করে থাকে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও), যারা আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে, তারা এই ঘটনার বিষয়ে প্রথম সতর্কবার্তা জারি করে। সংস্থাটি জানায়, ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দর থেকে আনুমানিক ৮৪ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থানকালে জাহাজটি থেকে প্রথম সন্দেহজনক গতিবিধির বার্তা পাঠানো হয়েছিল।
ইউকেএমটিও-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একটি সবুজ রঙের দ্রুতগামী ছোট নৌকা এবং একটি মাছ ধরার বড় ট্রলার যোগে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ট্যাংকারটির দিকে ধেয়ে আসছিল। ট্রলারটি মূলত আক্রমণের মূল সরঞ্জাম এবং জ্বালানি সরবরাহের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছোট নৌকাটি ব্যবহার করে বন্দুকধারীরা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ‘এম/টি ইউরেকা’-র ডেকের কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, আক্রমণের সময় ছিনতাইকারীরা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করছিল। যদিও এখন পর্যন্ত জাহাজের ক্রুদের শারীরিক অবস্থা বা কোনো ধরনের হতাহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে জাহাজটি বর্তমানে তার নির্ধারিত রুট থেকে বিচ্যুত হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ইয়েমেনের কোস্টগার্ড এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি যে এই ছিনতাইয়ের পেছনে হুতি বিদ্রোহীরা জড়িত নাকি সোমালি জলদস্যুদের কোনো গোষ্ঠী। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই রুটটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ নৌ-পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শাবওয়া প্রদেশ সংলগ্ন এই এলাকাটি আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যানেল।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘এম/টি ইউরেকা’ ছিনতাইয়ের ধরণটি জলদস্যুবৃত্তির চিরাচরিত কৌশলের সাথে মিল থাকলেও, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এর পেছনে অন্য কোনো গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে কোনো গোষ্ঠী এখন পর্যন্ত এই ঘটনার দায় স্বীকার করেনি।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌ-শক্তিগুলো (International Naval Forces) এবং ওই অঞ্চলে টহলরত বিভিন্ন দেশের যুদ্ধজাহাজগুলোকে জাহাজটির সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ এবং আঞ্চলিক নৌ-বাহিনীগুলো জাহাজটির গতিপথের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে। সোমালিয়ার জলসীমায় প্রবেশ করলে জাহাজটিকে উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
তেলবাহী ট্যাংকারটি কোন দেশের মালিকানাধীন এবং এতে কী পরিমাণ জ্বালানি তেল রয়েছে, তা নিরাপত্তার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এডেন উপসাগরে ক্রমবর্ধমান এই অস্থিতিশীলতা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
এই ছিনতাইয়ের ঘটনার পর ইউকেএমটিও এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি) ওই পথ দিয়ে চলাচলকারী সকল বাণিজ্যিক জাহাজকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে ছোট নৌকা বা ট্রলারের সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে দ্রুত নিকটস্থ কোস্টগার্ড বা নেভাল কমান্ডে রিপোর্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইয়েমেন উপকূলে এই ধরনের ঘটনা সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইয়েমেনি কোস্টগার্ড জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সমন্বয় করে জাহাজটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং অপরাধীদের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত ওই অঞ্চলের সমুদ্রসীমাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।