খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ফলাফল ঘোষণার পর ভারতের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একাধারে ক্ষমতাসীন থাকা তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তবে নির্বাচনের এই ফলাফলকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) এবং বিজেপির বিরুদ্ধে শতাধিক আসন ‘লুট’ করার অভিযোগ তুলেছেন।
সোমবার (৪ মে) সন্ধ্যায় কলকাতার কালীঘাটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন যোগসাজশ করে অন্তত ১০০টিরও বেশি আসনে কারচুপি করেছে। তার দাবি অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস অনেক আসনে জয়ী হলেও কমিশনের কর্মকর্তারা ফলাফল পাল্টে দিয়েছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপির কমিশনে পরিণত হয়েছে। আমি বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জানালেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এটি বিজেপির নৈতিক জয় নয়; বরং কেন্দ্রীয় বাহিনী, প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রাপ্ত একটি অবৈধ ফলাফল।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, এই ফলাফলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই বা গণআন্দোলনের মাধ্যমে তারা আবারও ঘুরে দাঁড়াবেন।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত ও যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, দলীয় অবস্থানের পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:
| রাজনৈতিক দল | প্রাপ্ত/অগ্ৰগামী আসনের সংখ্যা |
| ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) | ২০৬ |
| তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) | ৮১ |
| ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস | ০২ |
| এআইজেইউপি (হুমায়ুন কবির) | ০২ |
| সিপিআই(এম) | ০১ |
| এআইএসএফ | ০১ |
| মোট আসন | ২৯৪ |
পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম ১৪৮টি আসনের প্রয়োজন হলেও বিজেপি ২০৬টি আসন পেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এই ফলাফলের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা তিন মেয়াদের শাসনের অবসান ঘটল।
ভোট গণনা চলাকালীন সময় থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ধারাবাহিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দলটির অভিযোগ, বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার, মগরাহাট পূর্ব এবং মগরাহাট পশ্চিমের মতো শক্ত ঘাঁটিগুলোতে তৃণমূল প্রার্থীরা জয় নিশ্চিত করার পরও কমিশন দীর্ঘক্ষণ শংসাপত্র (সার্টিফিকেট) প্রদানে বিলম্ব করেছে।
গণনা চলাকালীন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গণনা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি গণনার পদ্ধতি এবং পোস্টাল ব্যালট যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তৃণমূলের দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে ভোট গণনাকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে ফলাফল বিজেপির অনুকূলে যায়।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই ঐতিহাসিক জয়কে সুশাসনের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় তিনি পশ্চিমবঙ্গের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে। এই নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে যে মানুষ বিকাশের রাজনীতি এবং সুশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের এই জয় ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।”
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের এই ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের পর ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছিলেন। এরপর ২০১৬ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনেও তিনি তার আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন। তবে ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক প্রচারণার ফলে তৃণমূলের এই বিপর্যয় ঘটেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য তৃণমূলের অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কমিশনের দাবি, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং সিসিটিভি নজরদারির মাধ্যমে ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও আইনি প্রতিকারের পথ খোলা রাখছেন। বিজেপির ২০৬ আসনের এই বিশাল জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে পরাজিত দলের প্রধানের এই অনমনীয় মনোভাব রাজ্যে পরবর্তী কয়েক দিন রাজনৈতিক অস্থিরতা বজায় রাখতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার এখন তৃণমূলের হাত থেকে বিজেপির হাতে স্থানান্তরিত হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।