এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
অগ্নিযুগের দীপ্ত এক নাম—প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নন, তিনি বাঙালি নারীর সাহস, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড ক্লার্ক। শৈশব থেকেই মেধাবী ও দৃঢ়চেতা প্রীতিলতা শিক্ষাজীবনে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯২৭ সালে খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ঢাকা ইডেন কলেজে অধ্যয়নকালে উচ্চ মাধ্যমিকে ঢাকা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডিস্টিংশনসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রীজীবনেই তিনি বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন। লীলা নাগ ও কল্যাণী দাসের নেতৃত্বে সংগঠিত নারী বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর ভিতরে স্বাধীনতার আগুন আরও প্রজ্বলিত হয়। পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন সূর্যসেন-এর নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রামের বিপ্লবী দলে—যেখানে তিনি ছিলেন প্রথম নারী সদস্যদের একজন।
প্রীতিলতা কেবল সংগঠকই নন, ছিলেন একজন সাহসী যোদ্ধা। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস আক্রমণ, রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখল এবং জালালাবাদ যুদ্ধসহ বিভিন্ন সশস্ত্র অভিযানে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে তাঁর দৃঢ়তা তাঁকে দ্রুতই বিপ্লবীদের আস্থাভাজন করে তোলে।
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর—ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব, যেখানে লেখা ছিল “Dogs and Indians not allowed”—সেই বর্ণবাদী অপমানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে নেতৃত্ব দেন প্রীতিলতা। পুরুষবেশে অভিযান পরিচালনা করে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় দলকে পরিচালিত করেন।
অভিযান সফল হলেও ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। গ্রেফতার হয়ে ব্রিটিশদের হাতে অপমানিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যুকেই বেছে নেন। সঙ্গে রাখা পটাসিয়াম সায়ানাইড সেবন করে তিনি আত্মোৎসর্গ করেন—মাত্র ২১ বছর বয়সে।
তাঁর এই আত্মদান শুধু একটি ঘটনার সমাপ্তি নয়, বরং এক নতুন অনুপ্রেরণার সূচনা। তাঁর সাহস ও ত্যাগ বিপ্লবীদের সংগ্রামকে আরও তীব্র ও উদ্দীপ্ত করে তোলে। সহযোদ্ধা কল্পনা দত্ত-সহ অসংখ্য তরুণ-তরুণী তাঁর পথ অনুসরণে অনুপ্রাণিত হন।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার আমাদের ইতিহাসে এক অনির্বাণ শিখা—যিনি শিখিয়ে গেছেন, স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগই সর্বোচ্চ মহিমা।
শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি এই অমর বীরকন্যাকে।