এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
সংগীত, সংগ্রাম আর দেশপ্রেম—এই তিনের অপূর্ব মেলবন্ধন যার কণ্ঠে, তিনি কল্যাণী ঘোষ। জন্ম থেকেই সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা এই গুণী শিল্পী শুধু সুরের সাধক নন, তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক সাহসী শব্দসৈনিক।
১৯৪৬ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পৈতৃক নিবাস রাউজান উপজেলার বীনাজুরী গ্রামে। মা লীলাবতী চৌধুরীর স্নেহছায়ায় অতি অল্প বয়স থেকেই সঙ্গীত, নৃত্য ও অভিনয়ে তাঁর হাতেখড়ি। পিতা মনোমোহন চৌধুরীও ছিলেন সংস্কৃতিমনা মানুষ—যা তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। খাস্তগীর গভঃ গার্লস হাই স্কুল, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরি সায়েন্সেও অধ্যয়ন করেন। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম বেতারে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনা।
১৯৭১—বাংলার ইতিহাসের রক্তাক্ত এক অধ্যায়। সেই সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠ হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস। তাঁর গান শুধু রণাঙ্গনে সাহস জুগিয়েছে তা-ই নয়, শরণার্থী শিবিরে, সীমান্তের ওপারে—অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে জাগিয়েছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
তিনি যুক্ত ছিলেন ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র সঙ্গে, যেখানে সনজীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক ও জহির রায়হান-এর মতো গুণীজনদের সঙ্গে কাজ করেছেন। কলকাতায় রুমা গুহ ঠাকুরতা-এর “ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার”-এর সদস্য হয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সঙ্গীত পরিবেশন করে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছেন।
সহশিল্পী হিসেবে পাশে ছিলেন তাঁর ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রবাল চৌধুরী এবং উমা খান। সম্মিলিতভাবে তাঁদের কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধ পেয়েছিল এক অনন্য শক্তি।
স্বাধীনতার পরও তাঁর কর্মযজ্ঞ থেমে থাকেনি। দীর্ঘ ৫৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করে চলেছেন তিনি। পাশাপাশি বাংলা একাডেমিতে ৩২ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে উপপরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অভিধান প্রণয়নসহ সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
তাঁর লেখা গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান, গণসঙ্গীত, বাংলাদেশের লেখক পরিচিতি, ছোটদের অভিধান, চরিতাভিধান প্রভৃতি।
দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত এই গুণী শিল্পী ২০২৪ সালে অর্জন করেছেন দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক—যা তাঁর অবদানের এক মহার্ঘ স্বীকৃতি।
আজকের এই বিশেষ দিনে, এই কণ্ঠযোদ্ধার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত শুভকামনা।
তাঁর কণ্ঠে স্বাধীনতার গান আরও বহু প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করুক—এই কামনায়।
শুভ জন্মদিন।