খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ‘সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ টানা তৃতীয়বার শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। হ্যাটট্রিক শিরোপার এই কঠিন মিশনে বাংলাদেশ দলের গন্তব্য এবার ভারতের গোয়া। তবে মূল টুর্নামেন্টে মাঠে নামার আগে নিজেদের ঝালিয়ে নিতে এবং জলবায়ুর সাথে মানিয়ে নিতে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ১৫ দিনের এক নিবিড় প্রস্তুতি ক্যাম্প করবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। আগামীকালই থাইল্যান্ডের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবে দলটি।
এবারের সাফ মিশনের জন্য ঘোষিত ২৩ সদস্যের স্কোয়াডে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। বিশেষ করে অভিজ্ঞ দুই ফুটবলার স্বপ্না রানী ও মুনকি আক্তারের বাদ পড়া ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত দুটি আসরে শিরোপাজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও পারফরম্যান্সের ঘাটতি এবং শৃঙ্খলার প্রশ্নে তাঁদের দলে রাখেননি প্রধান কোচ পিটার বাটলার।
রোববার বাফুফে ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোচ বাটলার তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি জানান যে, মাঠের পারফরম্যান্স এবং দলীয় শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে তিনি কোনো প্রকার আপস করতে প্রস্তুত নন। স্বপ্না ও মুনকি সম্পর্কে কোচের বক্তব্য ছিল বেশ জোরালো। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁদের বর্তমান খেলার মান আশানুরূপ নয় এবং নির্দেশনার প্রতি তাঁদের অবজ্ঞা পরিলক্ষিত হয়েছে। কোচের মতে, এই কঠোর সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে খেলোয়াড়দের নিজেদের ভুল বুঝতে এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সহায়তা করবে। বর্তমানে এই দুই খেলোয়াড় মূল দলের অনুশীলনের বাইরে রয়েছেন।
অষ্টম সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ আগামী ২৫ মে ভারতের গোয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে। গত দুই আসরে নেপালের মাটিতে নেপালকে হারিয়ে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হলেও, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এবার লড়াই হবে ভারতের মাটিতে। ভারত এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সফলতম দল এবং পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন। নিজ দেশে শিরোপা পুনরুদ্ধারে তারা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ সম্মেলনে কোচ পিটার বাটলার ও নবনিযুক্ত অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার আসন্ন টুর্নামেন্টের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন। বাটলার সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, এবারের পথটি গত দুইবারের তুলনায় অনেক বেশি কণ্টকাকীর্ণ হতে পারে। কেবল ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দল যেমন ভুটান ও নেপালও সাম্প্রতিক সময়ে টেকনিক্যাল এবং ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। প্রতিটি দলই এখন অনেক বেশি সংগঠিত, যা বাংলাদেশের হ্যাটট্রিক শিরোপার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মূল টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার আগে ব্যাংককে ১৫ দিনের কন্ডিশনিং ক্যাম্পটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ১০ ও ১৭ মে দুটি শক্তিশালী দলের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে সাবিনাহীন এই নতুন দলটির। এই ম্যাচগুলো কোচের জন্য নতুন কম্বিনেশন পরীক্ষা করার বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরপর ২১ মে ব্যাংকক থেকেই সরাসরি ভারতের গোয়ায় পৌঁছাবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
২০২৪ সালের এই সাফ মিশনে বাংলাদেশ দলে বড় ধরনের বিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। আগের আসরের নিয়মিত ১০ জন খেলোয়াড় এবার চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাননি। ইনজুরির কারণে ছিটকে গেছেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নবীরন খাতুন। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ও কৌশলগত কারণে দলের একসময়ের কান্ডারি সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানী সরকার, সানজিদা আক্তার ও মাসুরা পারভীনের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়রা স্কোয়াডের বাইরে রয়েছেন।
অভিজ্ঞদের অনুপস্থিতিতে কোচ বাটলার একঝাঁক তরুণ প্রতিভার ওপর আস্থা রেখেছেন। প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন স্বর্ণা রানী, হালিমা খাতুন ও সুরভী আকন্দ প্রীতির মতো উদীয়মান ফুটবলাররা। অর্পিতা বিশ্বাস ও মোমিতা খাতুনও একদম নতুন মুখ হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছেন।
আসন্ন সাফের জন্য নির্বাচিত খেলোয়াড়রা হলেন: রুপনা চাকমা, মিলি আক্তার, স্বর্ণা রানী মন্ডল, হালিমা আক্তার, শিউলি আজিম, আফঈদা খন্দকার (অধিনায়ক), সুরমা জান্নাত, কোহাতি কিসকু, সুরভী আকন্দ প্রীতি, শামসুন্নাহার সিনিয়র, উন্নতি খাতুন, অর্পিতা বিশ্বাস, মোমিতা খাতুন, মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা, শাহেদা আক্তার রিপা, ঋতুপর্ণা চাকমা, উমেহ্লা মারমা, মোছাম্মৎ সাগরিকা, তহুরা খাতুন, আনিকা রানী সিদ্দিকী ও শামসুন্নাহার জুনিয়র।
এক নতুন নেতৃত্বের অধীনে এবং তারুণ্যের উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে কতটা সফল হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। ভারত ও ভুটানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই নতুন স্কোয়াডটিই হবে লাল-সবুজের প্রধান অস্ত্র।