খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে ২০২৬
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ওপর ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) একাধিপত্য এবং বিশ্ব ক্রিকেটে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অফ-স্পিনার সাইমন হারমার। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিস্থিতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। হারমারের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের মতো বড় সাফল্য অর্জন করা সত্ত্বেও বিশ্ব ক্রিকেটের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সাইমন হারমারের বক্তব্যে উঠে এসেছে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির ওপর ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবের বিষয়টি। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, ভারতের বিশাল বাণিজ্যিক বাজারের কারণে যাবতীয় প্রশাসনিক ক্ষমতাও তাদের করায়ত্ত। হারমার বলেন:
“তাদের (ভারত) বাণিজ্যিক শক্তির কারণে যাবতীয় ক্ষমতাও তাদের হাতে রয়েছে। বিসিসিআই মূলত আইসিসিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমাদের করার খুব বেশি কিছু নেই। ক্রিকেটার হিসেবে আমরা কেবল সেটুকুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি যা আমাদের আয়ত্তের মধ্যে রয়েছে। হয়তো ভবিষ্যতে আমরা যদি আরও বেশি ট্রফি জিততে পারি, তবে এই ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটতে পারে।”
হারমারের এই মন্তব্য বিশ্ব ক্রিকেটের সেই পুরনো বিতর্ককেই পুনরুজ্জীবিত করেছে, যেখানে ক্রিকেটের তিন মোড়ল বা ‘বিগ থ্রি’ তত্ত্ব এবং লভ্যাংশ বণ্টনে ভারতের বড় অংশের মালিকানা নিয়ে প্রায়শই সমালোচনা হয়ে থাকে।
গত বছর ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত টেস্ট সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকা ২-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে, যেখানে সাইমন হারমার অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লিউটিসি) শিরোপাও ঘরে তোলে প্রোটিয়ারা। টানা এসব বড় সাফল্যের পরও হারমার মনে করেন, মাঠের বাইরের রাজনীতি বা ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রিকেটের মানের চেয়ে বাণিজ্যিক দিকের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
সাক্ষাৎকারে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা দলের বর্তমান সাফল্যের পেছনের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, প্রোটিয়া শিবিরে কোনো একক তারকানির্ভর সংস্কৃতির চেয়ে দলীয় সংহতি বেশি শক্তিশালী। তিনি দলের কোচ শুকরি কনরাডের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন:
“আমাদের দলে হয়তো কয়েকজন তারকা ক্রিকেটার রয়েছেন, তবে সবসময় দলের স্বার্থই সবার উপরে। যদি কোনো ক্রিকেটার প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারেন, তবে কোচ সরাসরি তাকে জবাবদিহি করতে পারেন। কোচের এই স্বচ্ছতা ও কঠোর অবস্থান আমার খুব পছন্দ। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমাকে খুব একটা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।”
দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটেও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে হারমারের। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ইংলিশ স্পিনারদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে স্পিনারদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। প্রতিভার অভাব না থাকলেও পরিকাঠামো ও মানসিকতার অভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
কাউন্টি ক্রিকেটের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে হারমার বলেন, “ইংল্যান্ডে স্পিনারদের অন্য পজিশনের খেলোয়াড়দের মতো সমান চোখে দেখা হয় না। সেখানে ১৮টি কাউন্টি দল রয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৩টি দলে স্পিন বোলিং কোচ রয়েছে। স্পিন বোলিংয়ের মানোন্নয়ন করতে হলে কোচিং প্যানেলে স্পিন বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা আরও বাড়ানো জরুরি।”
সাইমন হারমারের এই সাক্ষাৎকারটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন আইসিসির ভবিষ্যৎ মডেল এবং এফটিপি (ফিউচার ট্যুরস প্রোগ্রাম) নিয়ে বিভিন্ন দেশ তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করছে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই স্পিনারের দাবি অনুযায়ী, যদি মাঠের সাফল্য ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা বিশ্ব ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদী নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
বর্তমানে হারমার দক্ষিণ আফ্রিকা দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত খেলছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্রিকেট বিশ্বে ভারত যে পরিমাণ রেভিনিউ বা রাজস্ব জেনারেট করে, তার কারণেই আইসিসি বিসিসিআই-এর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হয়। এই বাণিজ্যিক আধিপত্য বনাম খেলার মানের ভারসাম্য রক্ষার লড়াই আগামী দিনে ক্রিকেটের নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
হারমারের এই খোলামেলা বক্তব্য ক্রিকেট বিশ্বে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে আইসিসির স্বায়ত্তশাসন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো সফল দলগুলোর প্রশাসনিক অবমূল্যায়ন নিয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। মাঠের ক্রিকেটে প্রোটিয়ারা আধিপত্য দেখালেও প্রশাসনিক টেবিলে তারা এখনো ব্রাত্য—হারমারের বক্তব্যে এই আক্ষেপই মূলত ফুটে উঠেছে।