ঢাকায় ও এর আশপাশে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় গোপনে ‘মিনি ল্যাব’ স্থাপন করে কেটামিন, কুশ, ইয়াবার নতুন সংস্করণ এবং ভেজাল মদ তৈরির একাধিক চক্রের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এসব ল্যাবে আন্তর্জাতিক সংযোগ ব্যবহার করে মাদক উৎপাদন ও পাচারের অভিযোগে বিদেশি নাগরিকসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অন্তত চারটি পৃথক মাদক উৎপাদন ল্যাব শনাক্ত হয়েছে। এসব ল্যাব থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক, কাঁচামাল ও উৎপাদন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ২৫ মার্চ উত্তরা এলাকায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে কেটামিন উৎপাদনের একটি গোপন ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়। ওই অভিযানে তিনজন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে তরল কেটামিন সরবরাহের অভিযোগে দুইজন ওষুধ ব্যবসায়ীও আটক হন। তদন্তে জানা যায়, অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত চেতনানাশক কেটামিন বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাউডারে রূপান্তর করে মাদক হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছিল। এই চক্র ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে অর্ডার গ্রহণ করে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করত। উৎপাদিত মাদক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মালয়েশিয়া, দুবাই ও শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হতো।
এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি বাসায় ইয়াবা তৈরির কারখানা শনাক্ত করা হয়। সেখান থেকে সাড়ে চার হাজার ইয়াবা এবং উৎপাদনের কাঁচামাল উদ্ধার করা হয়। ল্যাবের মালিক তোহিদুজ্জামান ওরফে শিমুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি পূর্বে আয়ুর্বেদিক ল্যাবরেটরিতে কেমিস্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং ট্যাবলেট উৎপাদনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইয়াবা তৈরি শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে ইয়াবা গুঁড়া করে বিভিন্ন রাসায়নিক ও রং মিশিয়ে নতুনভাবে প্রস্তুত করা হতো।
রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় ৭ জানুয়ারি কুশ নামের অপ্রচলিত মাদক উৎপাদনের আরেকটি ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়। তৌসিফ হাসান নামের একজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে এই ল্যাব স্থাপন করেন বলে তদন্তে জানা যায়। তার সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ল্যাবে কুশ গাছ চাষের জন্য তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। বিদেশ থেকে আনা বীজ, চাষ উপকরণ এবং প্রস্তুত মাদক উদ্ধার করা হয়।
একই সময় ভাটারা এলাকায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে ভেজাল মদ উৎপাদনের ল্যাবও শনাক্ত হয়। সেখানে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের বোতলে ভেজাল মদ ভরে বাজারজাত করা হতো। ল্যাব থেকে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক, ‘ওয়াশ’ এবং প্রস্তুত ভেজাল মদ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে শনাক্ত করে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নিচে সাম্প্রতিক অভিযানের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো—
| এলাকা |
মাদক উৎপাদনের ধরন |
প্রধান কার্যক্রম |
উদ্ধার সামগ্রী |
গ্রেপ্তার |
| উত্তরা |
কেটামিন ল্যাব |
কেটামিন পাউডার উৎপাদন ও রপ্তানি |
কেটামিন, কাঁচামাল |
৫ জন (বিদেশি ও স্থানীয়) |
| টঙ্গী |
ইয়াবা কারখানা |
নতুন ইয়াবা উৎপাদন |
ইয়াবা, রাসায়নিক |
১ জন |
| ওয়ারী |
কুশ চাষ ল্যাব |
কুশ গাছ চাষ ও প্রস্তুত |
গাছ, বীজ, সরঞ্জাম |
২ জন |
| ভাটারা |
ভেজাল মদ ল্যাব |
মদ উৎপাদন ও বোতলজাত |
রাসায়নিক, মদ |
২ জন |
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এসব চক্র সক্রিয় হয়েছে। তারা কঠোর নজরদারি ও অভিযানের মাধ্যমে এসব নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।