খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি-এর নারায়ণগঞ্জ শাখার মাধ্যমে গ্রাহকদের সম্পূর্ণ অজান্তে ও সম্মতি ছাড়াই শত শত কোটি টাকার ভুয়া ঋণ সৃষ্টির এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এই সুগভীর আর্থিক জালিয়াতির প্রতিকার এবং এর পেছনে জড়িতদের চিহ্নিত করতে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ২৬টি রপ্তানিমুখী পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ফোরাম বা ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী কারখানার মালিকেরা এই তথ্য ও দাবি উত্থাপন করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত অভিযোগে জানানো হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের কার্যকালে এই সুদূরপ্রসারী আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান ‘ডোয়াস ল্যান্ড অ্যাপারেলস’-এর স্বত্বাধিকারী আরিফুর রহমান সম্মিলিত উদ্যোক্তাদের পক্ষে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি ব্যাংকিং খাতের এই অনিয়মের কৌশল ব্যাখ্যা করে জানান, প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এবং তৎকালীন চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশে নারায়ণগঞ্জ শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই জালিয়াতি চক্র গড়ে তোলেন। তারা বৈধ গ্রাহকদের কোনো প্রকার অনুমতি বা স্বাক্ষর ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ভুয়া ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র (লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি) খোলেন এবং ব্যাংকের খাতায় বিপুল পরিমাণ কৃত্রিম দায় সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে অত্যন্ত সুকৌশলে এই কৃত্রিম ও অননুমোদিত দায়গুলোকে সংশ্লিষ্ট সাধারণ গ্রাহকদের নামে নিয়মিত ঋণ হিসেবে রূপান্তর করে দেখানো হয়।
স্বাভাবিক ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ১ কোটি টাকার সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করলে তারা সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ৭৫ লাখ টাকার ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র সুবিধা পাওয়ার আইনগত অধিকার ধারণ করে। কিন্তু আলোচিত এই ঋণ জালিয়াতির ক্ষেত্রে সকল নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে ১ কোটি টাকার বিপরীতে সাড়ে ৭ কোটি টাকা পর্যন্ত ভুয়া ঋণপত্র খোলা হয়েছে। প্রচলিত নিয়মে রপ্তানি থেকে অর্জিত আয় (এক্সপোর্ট প্রসিডস) দ্বারা এই ধরনের ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের দায় সমন্বয় বা পরিশোধ করার কথা থাকলেও, এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। এখানে ‘প্রিমিয়ার এক্সচেঞ্জ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ডলার ক্রয়ের ভুয়া হিসাব দেখিয়ে ঋণপত্রের দায় কাগুজে কলমে সমন্বয় করা হয় এবং সমপরিমাণ অর্থ গ্রাহকদের নামে নতুন ঋণ হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়। এই সুনির্দিষ্ট অনিয়মের ফলে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার মোট ৪৩টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামে এমন ভুয়া ঋণ তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৬টিই দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা। এই কারখানাগুলোতে একসময় ২৮ থেকে ৩০ হাজার দক্ষ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন, যা বর্তমানে এই কৃত্রিম ঋণ ও ব্যাংক হয়রানির কারণে সম্পূর্ণ বন্ধের মুখে পতিত হয়েছে।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার এই কথিত ঋণ জালিয়াতির কাঠামোগত গভীরতা এবং একটি নির্দিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার ওপর এর আর্থিক প্রভাবের পরিসংখ্যানগত বিবরণ নিচে দুটি পৃথক সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
সারণি ১: জালিয়াতির শিকার ‘টোটাল ফ্যাশন’ কারখানার হিসাব বিবরণী
| বিবরণী | অনুমোদিত ও ব্যবহৃত অর্থের পরিমাণ (টাকা) | জালিয়াতির পর প্রদর্শিত দায় (টাকা) |
| ব্যাংকের অনুমোদিত ঋণের সর্বোচ্চ সীমা | ৫০ কোটি | — |
| কারখানা কর্তৃক প্রকৃতপক্ষে উত্তোলিত ঋণ | ৪৮ কোটি | — |
| ২০২৩ সালে ভুয়া ঋণপত্রের মাধ্যমে প্রদর্শিত মোট দায় | — | ৩৬০ কোটি |
সারণি ২: সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবসম্পদ খতিয়ান
| সূচক বা খাত | সংশ্লিষ্ট সংখ্যা ও বিবরণ |
| নারায়ণগঞ্জ শাখায় ভুক্তভোগী মোট প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহক | ৪৩টি |
| যৌথভাবে তদন্তের দাবি জানানো রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা | ২৬টি |
| কারখানাসমূহে নিয়োজিত পূর্বতন মোট শ্রমিকের সংখ্যা | ২৮,০০০ থেকে ৩০,০০০ জন |
| বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরিত মোট লিখিত অভিযোগ পত্রের সংখ্যা | ২২টি |
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তোলেন। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান যে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের নিজস্ব প্রধান কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (ইন্টারনাল অডিট) এবং দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা দলের চোখ এড়িয়ে কীভাবে এত বড় পরিধির এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি আর্থিক জালিয়াতি বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে চলতে পারল।
ব্যবসায়ীরা জানান, এই গুরুতর অনিয়মের প্রতিকার ও ন্যায়বিচার চেয়ে তারা বিগত দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পর্যায়ক্রমে ২২টি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পত্র পাঠালেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সুরাহা মেলেনি। এমনকি এই বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রিমিয়ার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত কোনো গ্রাহকের নামে প্রকৃত অর্থে কত টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে, তার কোনো বিস্তারিত বা বৈধ হিসাব বিবরণী (ব্যাংক স্টেটমেন্ট) প্রকাশ করেনি। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী মালিকেরা অবিলম্বে এই বিশাল জালিয়াতির ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। একই সাথে তারা ব্যাংকের খাতায় প্রদর্শিত সকল ভুয়া দায় অনতিবিলম্বে বাতিল করার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষার জন্য সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
অন্য দিকে, উদ্ভূত এই বিশাল আর্থিক অনিয়ম ও সংকট মোকাবিলায় প্রিমিয়ার ব্যাংকের নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকের অতীতের সকল প্রকার অনিয়ম খতিয়ে দেখার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্বনামধন্য নিরীক্ষা সংস্থা ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং’ এবং স্থানীয় পর্যায়ের আরও ছয়টি শীর্ষস্থানীয় নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকের সার্বিক ফরেনসিক বা আইনগত নিরীক্ষার (ফরেনসিক অডিট) দায়িত্ব প্রদান করেছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ শাখার এই বিশেষ অনিয়ম ও জালিয়াতি তদন্তের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বহিরাগত নিরীক্ষা সংস্থাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের একজন অত্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে নিশ্চিত করেছেন যে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই এই বহিরাগত তদন্ত সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদন (প্রিলিমিনারি রিপোর্ট) ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকও অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী ২৬টি পোশাক কারখানার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য ও লেনদেনের প্রতিবেদন তলব করে সার্বিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।