খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
বাংলা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির জাতীয় চেতনার ইতিহাসে যে কজন মানুষ তাঁদের লেখনী দিয়ে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের অন্যতম Abdul Gaffar Chowdhury। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত সাংবাদিক, শক্তিমান কলামিস্ট, সাহিত্যিক এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
অমর একুশের অমর সংগীত—
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,
আমি কি ভুলিতে পারি…”
এই কালজয়ী গানের রচয়িতা তিনি। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের বেদনা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের গভীর অনুভূতি তাঁর এই গানকে শুধু একটি সংগীত নয়, বরং জাতির চিরন্তন আবেগে পরিণত করেছে।
১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বৃহত্তর বরিশালের নদীবিধৌত উলানিয়া গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সমাজচেতনার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। ১৯৪৭ সাল থেকেই স্থানীয় পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। পরবর্তীতে দৈনিক ইনসাফ, সংবাদ, ইত্তেফাক, আজাদ, জেহাদ, পূর্বদেশসহ অসংখ্য জাতীয় পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে সওগাত, দিলরুবা, মেঘনা প্রভৃতি সাহিত্যপত্রেও তাঁর লেখনী সমানভাবে সমাদৃত হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলা-য় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে সময় কলকাতার আনন্দবাজার এবং যুগান্তর পত্রিকায় কলামিস্ট হিসেবেও কাজ করেন। তাঁর লেখনী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি প্রকাশ করেন দৈনিক জনপদ। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যক্তিগত নানা প্রতিকূলতার কারণে ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। প্রবাসজীবনেও দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর টান কখনো কমেনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সমকালসহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোতে সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও ইতিহাস নিয়ে নিয়মিত লিখে গেছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্যেও তাঁর ছিল অসামান্য অবদান। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ত্রিশটি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, সম্রাটের ছবি, ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা, বাঙালি না বাংলাদেশি প্রভৃতি।
নাট্যকার হিসেবেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। তাঁর রচিত নাটকের মধ্যে পলাশী থেকে বাংলাদেশ, একজন তাহমিনা এবং রক্তাক্ত আগস্ট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র পলাশী থেকে ধানমন্ডি দেশ-বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল।
তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইউনেস্কো পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, শেরেবাংলা পদক, বঙ্গবন্ধু পদকসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন।
২০২২ সালের ১৯ মে লন্ডনের বার্নেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই কিংবদন্তি সাংবাদিক ও সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর লেখা, তাঁর চেতনা এবং তাঁর কণ্ঠস্বর আজও বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও ভাষা-চেতনার অমর কণ্ঠস্বর আবদুল গাফফার চৌধুরীকে।