শায়লা আহমেদ লোপা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাসংক্রান্ত একাধিক মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এর মধ্যে দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে চলমান মামলার উভয়পক্ষের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে এবং মামলাটি বর্তমানে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। অভিযোগপক্ষ ও প্রতিরক্ষাপক্ষের বিস্তারিত উপস্থাপনা শেষে আদালত এই মামলাটিকে বিচারিক সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রেখেছেন। হাসানুল হক ইনু বর্তমানে কারাবন্দী অবস্থায় আছেন। এই বিচারপ্রক্রিয়ার গভীরতা, সময়সীমা এবং সমতার মানদণ্ড নিয়ে তার পরিবার, আইনজীবী এবং বিভিন্ন মহলে আইনি ও পদ্ধতিগত নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে পরিচালিত এই বিচার প্রক্রিয়াটি মাত্র ৯ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক শেষ করার কারণে আইনি পরিমণ্ডলে ‘সংক্ষিপ্ত বিচার’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ, সাক্ষীদের জেরা করার জন্য তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি এবং জেরার সময় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া হাসানুল হক ইনুকে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে মৌখিক জবানবন্দি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে প্রতিরক্ষাপক্ষ দাবি করেছে।
পরবর্তীতে, ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল মামলার যুক্তিতর্ক আরম্ভ হয় এবং মাত্র ৯ কর্মদিবসের মধ্যে তা সম্পন্ন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক খণ্ডনের জন্য আসামিপক্ষকে মাত্র ১ দিন বা আনুমানিক ৩ ঘণ্টা সময় প্রদান করা হয়েছিল। আদালতের দৈনিক কার্যসূচি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ শুনানি সকাল ১১টার পর শুরু হয়ে দুপুর ২টার মধ্যেই শেষ হতো এবং বেশ কিছু দিন একই সঙ্গে আদালতের অন্যান্য মামলার কার্যক্রমও সমান্তরালভাবে পরিচালিত হয়েছে।
আইন সংশোধনের মাধ্যমে পুনর্গঠিত এই ট্রাইব্যুনালের আগের মামলাগুলোর তুলনায় হাসানুল হক ইনুর মামলার বিচারিক কার্যক্রমের মোট সময় ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে গোলাম আযমের মামলায় দীর্ঘ সময়ব্যাপী শুনানি, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের বিস্তৃত সুযোগ এবং প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের পর্যাপ্ত সময় নিয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আইনজ্ঞদের একাংশের মতে, এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যকার দৃশ্যমান পার্থক্য বিচারিক মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অবশ্য রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, শুনানির সময়সীমা ও কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ সম্পূর্ণভাবে আদালতের নিজস্ব প্রক্রিয়াগত এখতিয়ারের বিষয়।
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা ও সরকার পতনকেন্দ্রিক ঘটনাগুলোকে এই বিশেষ আইনি কাঠামোর আওতায় আনা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক আইনজ্ঞের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো সাধারণ ফৌজদারি আদালতের অধিক্ষেত্রভুক্ত এবং এগুলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ও ঘটনার ধরন নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, যা নিচের তালিকায় সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| উৎস/সংস্থা | সময়কাল ও প্রাপ্ত তথ্য | ঘটনার বিবরণ ও প্রেক্ষাপট |
| খবরওয়ালা | ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকাল পর্যন্ত | দেশব্যাপী প্রায় ২০০ জন মানুষের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছিল। |
| জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন | ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত | প্রায় ১৪০০ জন মানুষের মৃত্যুর একটি আনুমানিক পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়েছে। |
প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ৪ আগস্ট দেশব্যাপী ব্যাপক নৈরাজ্য, থানা ও কারাগারে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। কারাগারে হামলার মাধ্যমে আসামি ও কয়েদিদের বের করে আনা হয়। মানুষের জানমাল, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নিজেদের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়, যার ফলে সংঘর্ষে আন্দোলনকারীদের প্রাণহানি ঘটে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা হামলার শিকার হন এবং আন্দোলনকারীদের একাংশ কর্তৃক মানুষকে হত্যা করে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচারের ঘটনা ঘটে। ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আরও তীব্র রূপ নেয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যার একটি বড় অংশই ঘটেছে ৫ আগস্ট সরকার পতন ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরবর্তী সময়ে।
আইনজীবীদের মতে, কোনো সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডই কেবল ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’ বা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলোতে এক পক্ষকে আইন পাসের মাধ্যমে নতুন করে দায়মুক্তি দিয়ে কেবল অপর পক্ষকে ট্রাইব্যুনালে এনে সংক্ষিপ্ত বিচার করার বিষয়টি আইনি সমতার পরিপন্থী বলে প্রতিরক্ষাপক্ষ মনে করছে।
এই মামলার ঘটনাপ্রবাহে ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলির ধরন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন একাধিকবার উল্লেখ করেছিলেন যে, নিহত ও আহতদের শরীরে ৭.৬২ ক্যালিবারের গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের নিয়মিত পুলিশ বাহিনী সাধারণত এই ক্যালিবারের গুলি বা অস্ত্র ব্যবহার করে না। এই অস্ত্র ও গুলির উৎস অনুসন্ধানের জন্য ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত তদন্তের দাবি জানানো হলেও, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কোনো ব্যালেস্টিক বা ফরেনসিক প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মতে, থানা থেকে অস্ত্র লুট, সহিংস পরিস্থিতি এবং সুনির্দিষ্ট অস্ত্রের উৎসসংক্রান্ত বিষয়গুলো তদন্তের অপরিহার্য উপাদান হওয়া উচিত ছিল, যা এই মামলায় উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
মামলার একটি অন্যতম প্রধান আইনি বিতর্ক হলো—কোনো ঘটনার বিষয়ে স্রেফ অবগত থাকা বা তথ্য জানা থাকা এবং তা প্রতিরোধ না করা ফৌজদারি দায় (Criminal Liability) সৃষ্টি করে কি না। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের প্রতিষ্ঠিত সাধারণ নীতি অনুযায়ী:
কেবলমাত্র অবগত থাকা: কোনো অপরাধ বা সংঘর্ষের ঘটনা সম্পর্কে কেবল তথ্য জানা থাকা অপরাধ প্রমাণের জন্য এককভাবে যথেষ্ট নয়।
কার্যকর নিয়ন্ত্রণ (Effective Control): অপরাধ বা সহিংসতা ‘না থামানো’ তখনই ফৌজদারি দায় সৃষ্টি করে, যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর অভিযুক্তদের ওপর কার্যকর ও প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ থাকে।
কমান্ড রেসপনসিবিলিটি (Command Responsibility): এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে অপরাধে সংশ্লিষ্টদের সরাসরি নির্দেশ প্রদান, ইচ্ছাকৃত অবহেলা বা সুনির্দিষ্ট নেতৃত্বমূলক ভূমিকা প্রমাণ করা জরুরি।
হাসানুল হক ইনু ২০২৪ সালের ঘটনাবলির সময় সরকারের কোনো মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো পদে আসীন ছিলেন না। তিনি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বাইরের একটি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের (জাসদ) প্রধান এবং দলটির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের শরিক ছিলেন মাত্র। ঘটনার কোনো স্থানে তার ব্যক্তিগত উপস্থিতি ছিল না এবং দূরবর্তী স্থান থেকে মাঠপর্যায়ের সংঘর্ষ থামানোর মতো কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য তার ছিল না। ফলে স্রেফ জোটভুক্ত রাজনীতির কারণে তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে বলে ডিফেন্স টিম দাবি করেছে।
প্রতিরক্ষাপক্ষের দাবি অনুযায়ী, হাসানুল হক ইনুকে আদালতে তার পক্ষে তৈরিকৃত ৬৮ পৃষ্ঠার বিস্তারিত লিখিত বক্তব্য বা জবানবন্দি উপস্থাপন করতে দেওয়া হয়নি। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রপক্ষ কোনো অকাট্য তথ্য-প্রমাণ বা আইনি যুক্তি হাজির না করে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে মামলাটি পরিচালনা করেছে। এই ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকায় পুরো ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
হাসানুল হক ইনু দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বিগত বছরগুলোতে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার কট্টর সমালোচক ছিলেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে প্রতিহিংসামূলকভাবে তাকে এই একতরফা সংক্ষিপ্ত বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়ার সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রমাণের অকাট্যতার ওপরই ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নির্ভর করে এবং রাজনৈতিক সংঘাতের ফৌজদারি দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলন ঘটানো আবশ্যক।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক