খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগো শহরের একটি ইসলামিক সেন্টারের মসজিদে সংঘটিত ভয়াবহ সশস্ত্র বন্দুক হামলার সময় নিজের জীবন বাজি রেখে শতাধিক মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছেন নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ। এই নৃশংস হামলায় তিনি নিজে নিহত হলেও স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়, সাধারণ নাগরিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট তিনি এখন একজন অনন্য ‘বীর’ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন। গত সোমবার (১৮ মে, ২০২৬) সংঘটিত এই বর্বর হামলায় বীর নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহসহ আরও দুই জন সাধারণ মুসলিম মুসল্লি নিহত হন। সান ডিয়েগো শহরের পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই জঘন্য হামলাটি চালিয়েছে দুই জন কিশোর বয়সী বন্দুকধারী, যারা পরবর্তীতে নিজেরা আত্মহত্যা করেছে।
নিহত বীর নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ ব্যক্তিগত জীবনে আট সন্তানের জনক ছিলেন এবং তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ওই ইসলামিক সেন্টারে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সান ডিয়েগো শহরের পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াল গণমাধ্যমের সামনে তাঁর সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, সংকটময় মুহূর্তে আমিন আবদুল্লাহর গৃহীত পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ ছিল এবং তিনি নিজের জীবনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন।
সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে সংঘটিত হামলা, ক্ষয়ক্ষতি, বীরত্বপূর্ণ অবদান এবং উদ্ধারকৃত আলামতের সামগ্রিক বিবরণ নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| সুনির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ ও মূল সূচকসমূহ | সংশ্লিষ্ট প্রধান তথ্য এবং আইনগত বিবরণী |
| হামলা সংঘটিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট স্থান | ইসলামিক সেন্টারের মসজিদ, সান ডিয়েগো, যুক্তরাষ্ট্র |
| হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট দিন | সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ |
| নিহত বীর নিরাপত্তারক্ষীর নাম ও সন্তান সংখ্যা | আমিন আবদুল্লাহ (আট সন্তানের জনক) |
| হামলায় নিহত অপর দুই মুসল্লির নাম | মনসুর কাজিহা এবং নাদের আওয়াদ |
| নিরাপত্তারক্ষীর মাধ্যমে রক্ষিত মোট শিশুর সংখ্যা | প্রায় ১৪০ জন (ইসলামিক সেন্টারের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী) |
| হামলাকারীদের পরিচয় ও বর্তমান অবস্থা | দুই জন কিশোর বয়সী বন্দুকধারী (উভয়ই আত্মহত্যা করেছে) |
| জব্দকৃত মোট অবৈধ অস্ত্রের বিবরণ | ৩০টিরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং একটি ক্রসবো (ধনুকবিশেষ) |
| আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মূল ধরন | ঘৃণাজনিত অপরাধ বা বিদ্বেষমূলক অপরাধ হিসেবে তদন্তাধীন |
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন এবং ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, সশস্ত্র হামলাকারীরা যখন মসজিদের মূল প্রবেশমুখ দিয়ে ভেতরে দৌড়ে প্রবেশের চেষ্টা করছিল, তখন নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তাদের পথরোধ করেন এবং তাদের থামানোর চেষ্টা চালান। সে সময় বন্দুকধারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। তীব্র গুলির মুখেও আমিন আবদুল্লাহ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মসজিদের স্বয়ংক্রিয় অবরুদ্ধকরণ বা লকডাউন কার্যক্রম সচল করতে সক্ষম হন। তাঁর এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার ফলে ইসলামিক সেন্টারের অভ্যন্তরে থাকা বিদ্যালয়ের প্রায় ১৪০ জন কোমলমতি শিশু বন্দুকধারীদের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে সক্ষম হয়।
এই ঘটনায় নিহত অপর দুই সাহসী মুসল্লি হলেন—মনসুর কাজিহা এবং নাদের আওয়াদ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এই দুই ব্যক্তি মসজিদের গাড়ি পার্কিং স্থানে নিজেদের দিকে বন্দুকধারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন, যেন হামলাকারীরা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। তাঁদের এই আত্মোৎসর্গের কারণে মসজিদের অভ্যন্তরে থাকা শত শত মুসল্লির প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় মুসলিম সংগঠন ‘আমেরিকান-ইসলামিক সম্পর্ক বিষয়ক কাউন্সিল’ এর প্রধান মুখপাত্র তাজহীন নিজাম নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, “আমিন আবদুল্লাহ ছিলেন আমাদের সবার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। তিনি প্রতিদিন অত্যন্ত হাসিমুখে সবাইকে মসজিদে স্বাগত জানাতেন। তিনি আমাদের সমাজের একজন সত্যিকারের শহীদ এবং মহান নায়ক।” মসজিদ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আবদুল্লাহকে ‘অন্যদের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গকারী অত্যন্ত সাহসী মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই ভয়াবহ হামলার পরদিন গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আয়োজিত এক বিশেষ শোকসভায় আবদুল্লাহর কন্যা হাওয়া আবদুল্লাহ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমার বাবা সব সময় চাইতেন আমাদের এই সম্প্রদায় যেন সব সময় একসাথে মিলেমিশে থাকে। মানুষ যেন নিজেদের বাহ্যিক পরিচয় বা মতভেদ ভুলে আরও ভালো মানুষ হিসেবে সমাজ গঠন করে।”
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, হামলাটি সংঘটিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পূর্বে একজন হামলাকারীর মা স্থানীয় থানায় ফোন করে তথ্য দিয়েছিলেন যে, তাঁর ছেলে তাঁর এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে আকস্মিকভাবে বাড়ি থেকে চলে গেছে এবং সে মানসিকভাবে আত্মহত্যাপ্রবণ হতে পারে। এই তথ্যের কয়েক ঘণ্টা পরই ইসলামিক সেন্টারের বাইরে থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনজনকে উদ্ধার করা হয় এবং পরবর্তীতে কাছাকাছি একটি পার্ক করে রাখা গাড়ির ভেতর থেকে দুই সন্দেহভাজন হামলাকারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সান ডিয়েগো শহরের পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াল নিশ্চিত করেছেন যে, এই পুরো ঘটনাটি একটি চরম ঘৃণাজনিত বা বিদ্বেষমূলক অপরাধ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলাকারীদের সংশ্লিষ্ট তিনটি ভিন্ন বাড়িতে একযোগে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে ৩০টিরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং একটি ক্রসবো বা বিশেষ ধনুক উদ্ধার করেছে। এর পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে চরম ধর্মীয় ও বর্ণবাদী উগ্র মতাদর্শসংবলিত বিভিন্ন লিখিত নথিপত্র এবং একটি দীর্ঘ ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টো জব্দ করা হয়েছে।
শহরের মেয়র টড গ্লোরিয়া এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “এই জঘন্য হামলাকারীরা কোনোভাবেই আমাদের শান্তিকামী শহরের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং নিহত এই তিন জন সম্মানিত মুসলিম নাগরিকই আমাদের সমাজের প্রকৃত পরিচয় ও মানবিকতা বহন করেন।” অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতা জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, “রাজনৈতিক বা আদর্শিক সহিংসতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোনো বিষয়ে মতভেদ থাকলে আমাদের আলোচনার মাধ্যমে কথা বলতে হবে, কারো ওপর কাপুরুষের মতো গুলি চালিয়ে নয়।”