স্মরণ –
বৈষ্ণব কবি রাধারমন দত্ত
বাংলা লোকসংগীতের আকাশে যাঁদের সৃষ্টির আলো আজও সমান উজ্জ্বল, তাঁদের অন্যতম হলেন রাধারমন দত্ত। ধামাইল গানের জনক হিসেবে খ্যাত এই মহান সাধক-কবি শুধু সংগীত রচনা করেননি, তিনি বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, প্রেম, ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য ধারা নির্মাণ করেছিলেন।
১৮৩৩ সালের ২৫ মে সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার আতুয়াজান পরগণার কেশবপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা রাধামাধব দত্ত ও মাতা সুর্বণা দেবী ছিলেন জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তি। পারিবারিক পরিবেশেই ছোটবেলা থেকে সংগীত, সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয় ঘটে।
কৈশোর থেকেই তিনি সৃষ্টির রহস্য ও স্রষ্টার স্বরূপ অনুসন্ধানে আকৃষ্ট হন। জীবনের অর্থ খুঁজতে তিনি সাধুসন্তদের সান্নিধ্যে ঘুরেছেন, তাঁদের উপদেশ হৃদয়ে ধারণ করেছেন। পরবর্তীতে মৌলভীবাজারের ঢেউপাশা গ্রামের সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শাক্ত, বৈষ্ণব ও শৈব দর্শনের ওপর গভীর অধ্যয়ন শেষে তিনি সহজিয়া সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন।
নলুয়ার হাওরের নির্জন প্রকৃতির মাঝে একটি পর্ণকুটির নির্মাণ করে তিনি দীর্ঘদিন সাধনা ও ভজন-সঙ্গীতে নিমগ্ন ছিলেন। কৃষ্ণপ্রেমে আপ্লুত হয়ে তিনি রচনা করেন অসংখ্য পদ, ভজন ও লোকগান। তাঁর গান ছিল হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ—ভাবাবেগে বিভোর হয়ে তিনি গান গাইতেন, আর শিষ্যরা তা লিখে রাখতেন। এ কারণেই তাঁর নিজের হাতে লেখা কোনো পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় না।
রাধারমনের সৃষ্টিতে বৈষ্ণব ভাবধারার পাশাপাশি সুফিবাদের মানবিক ও প্রেমময় দর্শনেরও গভীর প্রভাব ছিল। তাঁর গানে প্রেম কখনো মানবিক, কখনো ঐশী; কখনো রাধাকৃষ্ণের মিলন-বিরহ, আবার কখনো মানুষের অন্তর্জগতের আকুতি হয়ে ধ্বনিত হয়েছে।
গ্রামবাংলার বিয়ে-শাদিতে আজও ধামাইল গান ছাড়া যেন আনন্দ পূর্ণতা পায় না। দুই বাংলার বেতার, টেলিভিশন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর গান এখনও সমান জনপ্রিয়। সাম্প্রতিক সময়েও বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক সংগীতায়োজনে তাঁর গান নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে পৌঁছে যাচ্ছে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন তিন পুত্রের জনক। কিন্তু স্ত্রী ও দুই পুত্রের আকস্মিক মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর শোক ও বৈরাগ্যের জন্ম দেয়। সেই বেদনা তাঁকে সংসারবিমুখ করে তোলে এবং তিনি আরও গভীরভাবে সাধনা ও ভজন-সঙ্গীতে নিমগ্ন হয়ে পড়েন।
তাঁর প্রথম পুত্র বিপিন বিহারী দত্ত পরবর্তীতে মৌলভীবাজারের ভুজবল গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আজও তাঁর বংশধরেরা সেই অঞ্চলে বসবাস করছেন এবং রাধারমনের স্মৃতি বহন করে চলেছেন।
জন্মভূমি কেশবপুর গ্রামেই এই মহাকবির দেহ সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিস্থল আজও ভক্ত, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে এক আবেগঘন স্মৃতিধাম। দীর্ঘদিন নিদুমনি দাস নামে এক সেবায়েত নিষ্ঠার সঙ্গে সমাধির দেখাশোনা করেছেন। বর্তমানে অনিতা রাণী মালাকার সেই দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯১৫ সালের ১০ নভেম্বর বাংলা লোকসংগীতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর গান, তাঁর দর্শন ও তাঁর সৃষ্ট প্রেমময় ভুবন আজও বাংলার মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
“ভোমর কইও গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া”—
এই একটিমাত্র পঙ্ক্তিই প্রমাণ করে, রাধারমন দত্ত কেবল একজন লোককবি নন; তিনি ছিলেন বাঙালির চিরন্তন হৃদয়ের ভাষ্যকার।