খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারমাণবিক বা অন্যান্য ভারী অস্ত্রের চেয়ে সামুদ্রিক মাইনের কৌশলগত ব্যবহার যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে বলে সামরিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই জ্বালানি সরবরাহ রুটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার অবরোধ ভাঙার চেষ্টা এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শন করলেও সমুদ্রতলে ইরানের পাতা মাইনের কারণে তাদের অভিযানগুলো জটিল রূপ ধারণ করেছে।
হরমুজ প্রণালীতে মাইন যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ইরানের নৌবাহিনী যে জলজ মাইন স্থাপন করেছে, তা নিষ্ক্রিয় করতে মার্কিন নৌবাহিনী আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন মাইন সুইপার (মাইন নিষ্ক্রিয়করণ জাহাজ) ব্যবহার করে জোরালো অভিযান পরিচালনা করছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) প্রতিনিয়ত মাইন অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সমুদ্রের তলদেশে অদৃশ্য অবস্থায় থাকা বিপুল পরিমাণ মাইন খুঁজে বের করে তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, যতবারই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাইন খুঁজে বের করার অভিযান পরিচালনা করছে, ততবারই তারা নানামুখী কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
সামুদ্রিক মাইনের প্রকারভেদ ও এর কার্যকারিতা জলপথে শত্রুপক্ষের নৌযান বা যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করার লক্ষ্যে ব্যবহৃত বিস্ফোরক ডিভাইসকে সামুদ্রিক মাইন বলা হয়। ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে মূলত তিন ধরনের মাইন ব্যবহার করছে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা। নিচে টেবিলের মাধ্যমে এগুলোর বিবরণ উপস্থাপন করা হলো:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও হোয়াইট হাউসের অবস্থান ইরানের ওপর আরোপিত বাণিজ্যিক ও নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের নমনীয়তা এখন এই মাইন সংকটের সমাধানের ওপর নির্ভর করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, মার্কিন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইতিমধ্যে প্রণালীর অসংখ্য মাইন ধ্বংস করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি ও বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হলে ইরানকে অবিলম্বে অবশিষ্ট সকল সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করতে হবে। শুক্রবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্টে ট্রাম্প সম্ভাব্য একটি চুক্তির শর্ত হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ মাইনমুক্ত ও দ্বি-পাক্ষিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চুক্তি বা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা এখনো সম্পন্ন হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক সতর্কতা ও বর্তমান পরিস্থিতি উদ্ভূত परिस्थितीत মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ওমানের মুসানদাম উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলীয় জলসীমায় চলাচলকারী সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ, নাবিক এবং পরিচালনাপর্ষদকে লক্ষ্য করে একটি জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। যৌথ সামুদ্রিক তথ্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, এই অঞ্চলে আঞ্চলিক হুমকির মাত্রা বর্তমানে “অত্যন্ত সংকটজনক”।
মার্কিন সামরিক দপ্তরের বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ইরান বেআইনিভাবে এই কৌশলগত আন্তর্জাতিক জলপথে মাইন বিছিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সকল আন্তর্জাতিক নৌযানকে হরমুজ প্রণালীর নির্ধারিত ‘ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম’ (Traffic Separation Scheme) এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সমুদ্রে অবস্থানকালীন সময়ে জাহাজগুলোকে সার্বক্ষণিকভাবে নৌ কর্তৃপক্ষের সাথে রেডিও যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং মার্কিন নৌবাহিনীর যেকোনো নিরাপত্তা নির্দেশনা তাৎক্ষণিকভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হরমুজ প্রণালীর এই মাইন সংকট আগামী দিনে ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।