খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরত্বে চান্দের পাড়াতে নির্মিত হয়েছে দেশের একমাত্র ঝিনুক আকৃতির দৃষ্টিনন্দন ‘আইকনিক রেলস্টেশন’। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর প্রায় ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আধুনিক ও সুবৃহৎ স্টেশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। যাত্রীদের আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্টেশনটিতে বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে উদ্বোধনের দীর্ঘ আড়াই বছর পার হলেও স্টেশনটিতে অধিকাংশ জরুরি যাত্রীসেবা ও সুযোগ-সুবিধা এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
২৯ একর বিশাল জমির ওপর নির্মিত ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই ছয়তলা রেলস্টেশনের সঙ্গেই সচল করা হয় ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ’। অত্যন্ত লাভজনক এই রেলপথে প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ানো হয়নি ট্রেনের সংখ্যা। এছাড়া, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার অভাবে এই রেলপথে প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটছে, যা যাত্রী ও স্থানীয় মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি, এই দীর্ঘ রেলপথে এখনও পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে পণ্য পরিবহনের কোনো সুযোগ বা বিশেষ ট্রেন চালু করা যায়নি।
ছয়তলা বিশিষ্ট এই আধুনিক স্টেশন ভবনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন তলায় যাত্রীদের বিনোদন, উন্নত বিশ্রাম ও কেনাকাটার জন্য বিশাল অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন তলার বিশদ বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
নিচতলা: প্রধান তথ্যকেন্দ্র, নামাজের স্থান বা মসজিদ, শিশুদের বিনোদন এলাকা, যাত্রীদের বসার সাধারণ লাউঞ্জ এবং পারাপারের জন্য পদচারী-সেতু।
দ্বিতীয় তলা: আধুনিক শপিং মল বা বিপণিবিতান, শিশুযত্ন কেন্দ্র এবং উন্নত মানের রেস্তোরাঁ।
তৃতীয় তলা: ৩9টি সুসজ্জিত কক্ষবিশিষ্ট তারকা মানের আধুনিক হোটেল।
চতুর্থ তলা ও অন্যান্য ফ্লোর: রেস্তোরাঁ, শিশুযত্ন কেন্দ্র, সম্মেলন কক্ষ এবং রেল কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কার্যালয়।
বাহ্যিক অংশ: ভবনের সামনের অংশে ঝিনুকের আদলে তৈরি পানির ফোয়ারা এবং যানবাহন রাখার জন্য দুটি পৃথক গাড়ি পার্কিং এলাকা।
স্টেশনটি উদ্বোধনের সময় ঘোষণা করা হয়েছিল যে, কোনো পর্যটক চাইলে শহরে বাড়তি হোটেল ভাড়া না করেই কেবল স্টেশনের লকার বা লাগেজ রাখার স্থানে নিজেদের মালামাল ভাড়ার বিনিময়ে গচ্ছিত রাখতে পারবেন। এর ফলে পর্যটকরা সারা দিন সমুদ্রসৈকত বা দর্শনীয় স্থান ঘুরে রাতের ট্রেনে পুনরায় ফিরে যেতে পারতেন। তবে আড়াই বছর পার হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি চালু করা সম্ভব হয়নি, যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ‘ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’ তাদের সব নির্মাণ কাজ শেষ করে গত মার্চ মাসেই ভবনটি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে।
বর্তমানে স্টেশনে আসা যাত্রীরা চরম ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। ট্রেন থেকে নেমে পূর্ব পাশের অত্যন্ত সরু একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়ে যাত্রীদের বের হতে হয়, একই পথ দিয়ে অন্য যাত্রীরা ট্রেনে ওঠার জন্য প্রবেশ করেন। এর ফলে সেখানে প্রচণ্ড ভিড় ও হুড়োহুড়ি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মালামাল নিয়ে বের হতে গিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এত বড় স্টেশনে সাধারণ ব্যবহার্য প্রক্ষালন কক্ষ বা টয়লেটের সংখ্যা মাত্র একটি হওয়ায় সেখানে নারী, পুরুষ ও শিশুদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। তাছাড়া, নিচতলার তথ্যকেন্দ্র, শিশু বিনোদনকেন্দ্র ও রেস্তোরাঁসহ উন্নত মানের চলন্ত সিঁড়ি ও স্ক্যানার মেশিনগুলোও বর্তমানে বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ভবনের সম্মুখভাগের প্রধান ঝিনুক ফোয়ারার প্রবেশপথটি বন্ধ থাকায় যাত্রীদের বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং ফোয়ারাটিতে পানির কোনো বিচ্ছুরণ নেই।
স্টেশন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, এই পূর্ণাঙ্গ ভবনটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য আগামী জুলাই মাসে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) এবং এই রেল প্রকল্পের পরিচালক জানান যে, বর্তমানে যাত্রীদের জন্য সাধারণ ওয়েটিং হল বা বসার স্থান ও স্ক্যানার চালু থাকলেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। জুলাই মাসে বেসরকারি তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ সম্পন্ন হলে যাত্রী দুর্ভোগ লাঘব হবে।
আইকনিক রেলস্টেশনের সুযোগ-সুবিধা ও বর্তমান পরিচালনাগত অবস্থার একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| স্টেশনের সুযোগ-সুবিধা ও সেবা | উদ্বোধনের সময় ঘোষিত প্রতিশ্রুতি | বর্তমান বাস্তব অবস্থা | চালুর সম্ভাব্য সময়কাল |
| মালামাল রাখার লকার সেবা | পর্যটকদের মালামাল সাময়িক গচ্ছিত রাখা | সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে | জুলাই ২০২৬ |
| প্রক্ষালন কক্ষ (টয়লেট) সুবিধা | পর্যাপ্ত ও আধুনিক ব্যবস্থা | মাত্র একটি সচল (দীর্ঘ লাইন) | বেসরকারি ব্যবস্থাপনার পর |
| চলন্ত সিঁড়ি ও স্ক্যানার যন্ত্র | আধুনিক যাতায়াত ও নিরাপত্তা পরীক্ষা | সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে | নিয়মিত সচল করার প্রক্রিয়া চলমান |
| বাণিজ্যিক বিপণিবিতান ও হোটেল | তারকা মানের হোটেল ও শপিং মল | অলস পড়ে আছে, নষ্ট হচ্ছে | জুলাই ২০২৬ (দরপত্র সাপেক্ষে) |
২০১৮ সালের জুলাই মাসে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন’, ‘চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন’ এবং বাংলাদেশের ‘তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’ ও ‘ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’ যৌথভাবে দুই ভাগে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এই পথে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। শুরুতে এক জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও বর্তমানে সপ্তাহের ছয় দিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করছে।
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটারের এই রেলপথে মোট ৯টি উপ-রেলস্টেশন রয়েছে। তবে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে সরাসরি চলাচলকারী দুই জোড়া ট্রেনের কোনোটিই চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো উপ-স্টেশনে যাত্রা বিরতি না করায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ এই রেলসেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন। এই দীর্ঘ রেলপথের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো। এই পথের মোট ৭২টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৫৬টিতেই কোনো গেটম্যান কিংবা স্বয়ংক্রিয় প্রতিবন্ধক বা ব্যারিয়ার নেই। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মাসে অসতর্কভাবে রেললাইন পার হতে গিয়ে এবং ট্রেনের ধাক্কায় মোট ৩৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গত বছরের ১৩ অক্টোবর রাতে অসতর্ক রেললাইনের কারণে ট্রেনের ধাক্কায় একটি বন্য হাতিরও মৃত্যু ঘটে।
রেলপথের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে লেভেল ক্রসিং ও গেটম্যানের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
রামু-কক্সবাজার অংশ: মোট ৮টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে গেটম্যান রয়েছেন মাত্র ১টিতে।
ডুলাহাজারা-ইসলামাবাদ অংশ: ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অংশে ১২টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে গেটম্যান আছেন মাত্র ১টিতে।
চকরিয়া-ডুলাহাজারা অংশ: ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অংশে ৯টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে গেটম্যান নিয়োজিত আছেন ৩টিতে।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় স্থায়ী জনবল অনুমোদন না দেওয়ায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, যদিও বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় সাময়িকভাবে কিছু গেটম্যান নিয়োজিত আছেন। প্রকল্প পরিচালক সুনির্দিষ্ট করে জানান যে, প্রতিটি অনুমোদিত গেটের সামনে সতর্কতামূলক ফলক রয়েছে এবং মানুষের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ রেলপথে ৪৬টি আন্ডারপাস বা ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মতে, এই দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি ক্রসিংয়ে স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ, স্বয়ংক্রিয় সংকেত ব্যবস্থা চালু এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে রেল আইন সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা আবশ্যক।
কক্সবাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ সময় পার হলেও এই লাভজনক রেলপথে পণ্যবাহী ট্রেন চালু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। যদি পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা যেত, তবে কক্সবাজারে উৎপাদিত প্রচুর পরিমাণ লবণ, শুঁটকি, সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ি অত্যন্ত কম খরচে সারা দেশে সরবরাহ করা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যও দেশের অন্যান্য স্থানে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সহজ হতো।
কক্সবাজারের হোটেল, গেস্টহাউস ও রিসোর্ট মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান যে, প্রতি বছর কক্সবাজারে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক ভ্রমণে আসেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হলো দুই লেনের জরাজীর্ণ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, যেখানে মাত্র তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এই পরিস্থিতিতে রেলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হতো। স্টেশনটির বাণিজ্যিক অংশগুলো অলস পড়ে থাকায় সরকারি রাজস্ব যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি স্থাপনাগুলোও দীর্ঘ অব্যবস্থাপনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রেন চালুর বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, দ্রুত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে বর্তমানে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা ও পরিকল্পনা চলমান রয়েছে।