খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
টানা কয়েক বছর ধরে বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক নানা কারণে বিদ্যমান এই সংকটগুলো দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির কিছু সূচকে কিছুটা স্বস্তির আভাস মিললেও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, এই স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। কারণ, সাময়িক এই অর্জনের আড়ালে বহু অমীমাংসিত কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং এই স্বস্তিকে স্থায়ী রূপ দিতে অবিলম্বে অর্থনীতির গভীর কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। ব্রিফিংয়ের মূল বিষয়বস্তু ছিল—‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি : উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’। অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানসহ সংস্থার অন্যান্য গবেষকবৃন্দ।
সিপিডির মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার কাগজে-কলমে কিছুটা কমলেও তা খাতের প্রকৃত স্বাস্থ্যকর বা গুণগত উন্নতি নির্দেশ করে না। ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ, বিশেষ পুনর্গঠন এবং রাইট-অফ (অবলোপন) করার মতো হিসাবগত পদক্ষেপের কারণে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত সংকটকে আড়াল করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫.৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তা কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৩২.২৬ শতাংশে নেমে আসে। তবে এই হ্রাসকে প্রকৃত অর্থে সম্পদের মানের উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমানে দেশের ১৭টি ব্যাংকের সম্পদমান পর্যালোচনা (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনা শেষ হয়েছে এবং সেখানে প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে খেলাপি ঋণের তথ্য মিলেছে। এটি ব্যাংকের অফিশিয়াল তথ্যের সাথে প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বড় ধরনের অমিল ও পার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়।
একই সাথে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের চাহিদা দুর্বল রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে মোট তরল সম্পদের বিপরীতে অতিরিক্ত তারল্যের হার ছিল ৪৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চ মাসে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অপরদিকে একই সময়ে ঋণ-আমানত রেশিও (এডিআর) ০.৮৯ থেকে হ্রাস পেয়ে ০.৮৪ হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তহবিল বা অর্থ থাকলেও ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে তাদের সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম রয়েছে।
সিপিডির বিশদ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বর্তমান বাস্তবতায় অবাস্তব হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ মেয়াদে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ। ফলে বাজেট নির্ধারিত চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ৮৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বাস্তবে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হলেও জুলাই-এপ্রিল মেয়াদে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। সামগ্রিক এই রাজস্ব ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া রাজস্ব সংগ্রহ সংক্রান্ত শর্তসমূহ পূরণ করা নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও কমেনি, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ও সেবা খাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির এই চাপ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১৬ শতাংশে উন্নীত হলেও সার্বিক মূল্যস্ফীতি তার চেয়ে বেশি (৯.০৪ শতাংশ) থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইন ও বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি দেশের এই অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে বলে সিপিডির ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত ব্যাংকিং খাত ও মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত মূল ফ্যাক্ট ও ডেটাসমূহ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| সূচকের বিবরণ | পূর্ববর্তী সময়কাল ও হার | সাম্প্রতিক সময়কাল (২০২৬) ও হার | পরিবর্তনের ধরন / বর্তমান স্থিতি |
| মোট খেলাপি ঋণের হার | ৩৫.৭% (সেপ্টেম্বর, ২০২৫) | ৩২.২৬% (মার্চ, ২০২৬) | কাগজে-কলমে হ্রাস (প্রকৃত সংকট আড়াল) |
| অতিরিক্ত তারল্যের হার | ৪৩% (মে, ২০২৫) | ৫৫% (মার্চ, ২০২৬) | বৃদ্ধি (ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে সতর্কতা) |
| ঋণ-আমানত রেশিও (ADR) | ০.৮৯ (মে, ২০২৫) | ০.৮৪ (মার্চ, ২০২৬) | হ্রাস (বেসরকারি খাতে দুর্বল ঋণচাহিদা) |
| সার্বিক মূল্যস্ফীতি | — | ৯.০৪% (এপ্রিল, ২০২৬) | উচ্চ ও অনমনীয় চাপ |
| খাদ্য মূল্যস্ফীতি | — | ৮.৩৯% (এপ্রিল, ২০২৬) | দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা |
| খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি | — | ৯.convert% $\rightarrow$ ৯.৫৭% (এপ্রিল, ২০২৬) | সেবা ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব |
| মজুরি বৃদ্ধির হার | — | ৮.১৬% (এপ্রিল, ২০২৬) | মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম (ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস) |
| রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি | — | ১,০৪,৫Mz $\rightarrow$ ১,০৪,৫৩৩ কোটি টাকা | জুলাই-এপ্রিল মেয়াদের ঘাটতি |