খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার তুলনায় দেশের বীমা খাতের পরিধি এখনো বেশ সীমিত। জাতীয় তথ্য অনুযায়ী, দেশে বীমা অনুপ্রবেশের হার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে উঠানামা করছে, যা আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। সমতল অঞ্চলের তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানে এই সেবার বিস্তৃতি আরও বেশি সংকীর্ণ। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকদের মতে, মূলত ভাষাগত জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণার অভাব, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং জাতীয় পর্যায়ের আস্থার সংকটের কারণে পাহাড়ের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বীমা সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছেন।
পার্বত্য অঞ্চলে বীমা সেবার প্রসারে প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ভাষা। বীমা দলিলের শর্তাবলীতে ব্যবহৃত প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি শব্দসমূহ যেমন—অর্পণ মূল্য (সারেন্ডার ভ্যালু), ল্যাপসড পলিসি কিংবা বোনাস সমর্পণ ইত্যাদি পরিভাষা সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জটিল মনে হয়। পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও ম্রোসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব মাতৃভাষা থাকায় এই দাপ্তরিক বাংলা শব্দগুলো তাদের কাছে আরও বেশি দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। ফলে বহু সম্ভাব্য গ্রাহক শুরুতেই এই খাতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভৌগোলিক দুর্গমতা। পাহাড়ি অঞ্চলের গ্রামগুলো একটি অন্যটি থেকে বেশ দূরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বীমা প্রতিনিধিদের পক্ষে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া, অধিকাংশ মাঠকর্মী সমতল ভূমি থেকে যাওয়ার কারণে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত থাকে। এর ফলে গ্রাহকদের সাথে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। যাতায়াত ব্যবস্থার অতিরিক্ত খরচ ও লজিস্টিক সহায়তার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বীমা খাতের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থার অভাব পার্বত্য অঞ্চলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেকেরই ধারণা, নিয়মিত প্রিমিয়াম দেওয়ার পরও প্রয়োজনের সময়ে দাবি আদায় করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এই আশঙ্কার পেছনে জাতীয় পর্যায়ের কিছু বাস্তব পরিসংখ্যান কাজ করছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশের বীমা খাত মোট ৪,৬০০ কোটি টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে। এর বিপরীতে দাবি পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২,২২১ কোটি টাকা, যা মোট প্রিমিয়ামের প্রায় ৪৮ শতাংশ। এই সময়ে বীমা খাতে মোট বকেয়া দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯,৬২৪ কোটি টাকা।
আলোচ্য নয় মাসে বীমা খাতের গড় দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ। লাইফ ও নন-লাইফ বীমা খাতের এই প্রিমিয়াম সংগ্রহ ও দাবি নিষ্পত্তির চিত্র নিচে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বীমার প্রকারভেদ | প্রিমিয়াম সংগ্রহ (কোটি টাকা) | দাবি পরিশোধ (কোটি টাকা) | দাবি নিষ্পত্তির হার |
| লাইফ বীমা | ৩,০৫০ | ২,১০৬ | ৩৫.১৮ শতাংশ |
| নন-লাইফ বীমা | ১,৫৪৭ | ২৭৫ | ৭.৫৫ শতাংশ |
| সর্বমোট | ৪,৬০০ | ২,২২১ | ২৩ শতাংশ (গড়) |
জাতীয় পর্যায়ের এই কম নিষ্পত্তির হার সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পাহাড়ি অঞ্চলেও পড়ছে।
পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, পলিসি বিক্রির শুরুতে মাঠকর্মীরা সহজ ভাষায় বিভিন্ন সুবিধার কথা বললেও, মেয়াদ শেষে অর্থ উত্তোলন বা দাবি আদায়ের সময়ে জটিল নথিপত্র এবং দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমানে বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবহৃত অধিকাংশ লিфলেট, পুস্তিকা ও প্রচারসামগ্রী শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় তৈরি করা হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেমন চাকমা বা মারমা ভাষার জন্য কোনো আলাদা তথ্যপত্র বা নির্দেশিকা থাকে না, যার ফলে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টাগুলো মাঠে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।
ভাষা ও নৃবিজ্ঞান বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে এই খাতের উন্নয়ন করতে হলে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বীমার গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো স্থানীয় ভাষায় রূপান্তর করতে হবে এবং স্থানীয় তরুণ-труণীদের মাঠকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। এর ফলে গ্রাহকদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে এই অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত ক্ষুদ্র বীমা ব্যবস্থা চালু করা এবং স্থানীয় ভাষায় সচেতনতামূলক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। এসব বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আসবে এবং দেশের বীমা খাত আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।