খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা সদরের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্য দিবালোকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনায় দেশের প্রচলিত আইনের অধীনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিৎ কর্মকার নিজে বাদী হয়ে শরীয়তপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলাটি রুজু করেছেন। দায়েরকৃত মামলাটিতে আটজন নামীয় ব্যক্তির পাশাপাশি আরও ৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে মূলত অবৈধ চাঁদাবাজি এবং চাঁদা দাবির উদ্দেশ্যে মারধর করার অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল সোমবার শরীয়তপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আব্দুল্লাহ আল হাসিব মামলাটি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাকে এটিকে নিয়মিত মামলা বা এফআইআর (FIR) হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
ডামুড্যা থানা ও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সুজিৎ কর্মকার ২০১৩ সালে ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। সুদীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনের পর, প্রায় দুই বছর পূর্বে স্থানীয় একটি পক্ষের সাথে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিষয় নিয়ে তাঁর তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই স্থানীয় পক্ষটি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের হেনস্তা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলে। এই বিরোধের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তথা সরকার পতনের পর, প্রধান শিক্ষক সুজিৎ কর্মকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনের নিকট একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। প্রশাসনিক এই জটিলতা ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে তিনি আর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হননি এবং বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছুটি কাটিয়ে আসছিলেন।
দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পর, গত রোববার সকালে প্রধান শিক্ষক সুজিৎ কর্মকার একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা যোগে ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে এসে পৌঁছান। প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি অটোরিকশা থেকে নামার সাথে সাথেই সেখানে অবস্থানরত কয়েকজন তরুণ তাঁর পথরোধ করেন এবং বিদ্যালয়ে প্রবেশে চরম বাধা সৃষ্টি করেন। এক পর্যায়ে তরুণরা তাঁকে লক্ষ্য করে বেধড়ক মারধর শুরু করেন এবং জোরপূর্বক পুনরায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে দিয়ে ঘটনাস্ল থেকে তাড়িয়ে দেন। এই হামলার কয়েকটি ভিডিও চিত্র পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। হামলার শিকার আহত শিক্ষককে তাঁর স্বজনেরা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণের পর, গতকাল সোমবার দুপুরে তিনি শরীয়তপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন।
সংঘটিত ঘটনা ও দায়েরকৃত মামলার প্রধান প্রধান তথ্যসমূহ নিচে একটি ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
হামলার শিকার ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিৎ কর্মকার প্রথম আলোকে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের ভেতর ও বাইরের একটি পক্ষ আমার ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। ওই চক্রের সদস্যরা রোববার আমাকে বেধড়ক মারধর করেছেন। আমি বাধ্য হয়ে তাঁদের বিপক্ষে আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছি।”
বাদীপক্ষের নিযুক্ত আইনজীবী জসিম উদ্দিন মামলার আইনি দিক ব্যাখ্যা করে বলেন, “ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিৎ কর্মকারের ওপর হামলার ঘটনায় আদালতে একটি মামলা করা হয়েছে। বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে এফআইআরের নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় আট ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৯ জন অজ্ঞাত আসামি রয়েছেন। অভিযোগের সপক্ষে বিভিন্ন তথ্য–প্রমাণ আমরা আদালতে উপস্থাপন করেছি।”
অন্যদিকে, স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান ব্যাখ্যা করে ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে জানান যে, প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় সরাসরি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তিনি বলেন, “আদালতে মামলা হয়েছে, এমন কথা শুনেছি। সেখান থেকে কোনো কাগজ আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। আদালত মামলা এফআইআর করার নির্দেশনা দিলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।” আদালতের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনামা হাতে পাওয়া মাত্রই পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে থানা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।