খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দিনদুপুরে চুরির অভিনব এক ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নে পল্লী বিদ্যুতের একটি অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফরমার চুরির চেষ্টা করার সময় স্থানীয় জনসাধারণের হাতে হাতেনাতে আটক হয়েছেন দুই যুবক। মঙ্গলবার (৯ জুন) জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামে এই চুরির প্রচেষ্টা ও আটকের ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার সময় দুই যুবক কৌশলে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমারটি নামানোর চেষ্টা করছিলেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সাহসিকতা এবং তাৎক্ষণিক সতর্কতার কারণে চুরির এই ঘটনাটি নস্যাৎ করা সম্ভব হয় এবং অভিযুক্তদের আটক করা হয়।
জনতার হাতে আটক হওয়া এবং পরবর্তীতে পুলিশের হেফাজতে যাওয়া দুই যুবকের পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ। আটককৃতদের মধ্যে প্রথমজন হলেন ২১ বছর বয়সী তরুণ মেহেদী হাসান আকাশ। তিনি মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার অন্তর্গত ৮ নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়নের হাজ্বীশ্বরাই গ্রামের বাসিন্দা ইকবাল হোসেনের ছেলে। আটক হওয়া দ্বিতীয় যুবক হলেন ২২ বছর বয়সী সায়েদ শেখ। তার স্থায়ী ঠিকানা পিরোজপুর জেলার সদর উপজেলার অন্তর্গত কান্দাডুবি গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের বাসিন্দা হাবিব শেখের ছেলে। এই দুই যুবক মিলে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ এলাকায় এসে এই চুরির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন বলে প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে গোপীনাথপুর এলাকার একটি নির্জন স্থানে রাস্তার পাশে থাকা পল্লী বিদ্যুতের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমার খোলার কাজ করছিলেন মেহেদী হাসান আকাশ ও সায়েদ শেখ। সাধারণত দিনদুপুরে এভাবে কোনো রকম সরকারি যানবাহন বা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ছাড়া ট্রান্সফরমার খুলতে দেখে ওই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী স্থানীয় এলাকাবাসীর মনে তীব্র সন্দেহ দানা বাঁধে। এ সময় উপস্থিত লোকজন তাদের সেখানে কাজ করার কারণ এবং পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে, ওই দুই যুবক নিজেদের বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়মিত কর্মী হিসেবে দাবি করেন। তারা জানান যে, লাইনের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের জন্যই তারা ট্রান্সফরমারটি খুঁটি থেকে নিচে নামাচ্ছেন।
নিজেদের বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিলেও ওই দুই যুবকের আচরণ, কথাবার্তা এবং কাজ করার অপেশাদার পদ্ধতি দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্দেহ দূর হয়নি। বরং তাদের কর্মকাণ্ড আরও বেশি সন্দেহজনক মনে হতে থাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীরা নিজেদের উদ্যোগে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে সরাসরি যোগাযোগ করেন। তারা বিদ্যুৎ অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের জানান যে, গোপীনাথপুর গ্রামে তাদের কর্মীরা ট্রান্সফরমার মেরামতের কাজ করছেন কি না। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়ে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা অবাক হন এবং জানান যে, ওই এলাকায় তাদের কোনো কর্মী বা টেকনিশিয়ানকে এমন কোনো কাজের জন্য পাঠানো হয়নি।
ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে এবং চুরির বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল ও দায়িত্বরত কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা দুই যুবকের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র ও বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমতিপত্র যাচাই করেন। দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন যে, এই দুই যুবকের সাথে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। তারা মূলত পল্লী বিদ্যুতের মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ ট্রান্সফরমার চুরির উদ্দেশ্যে সেখানে এসেছিলেন এবং তারা পেশাদার ট্রান্সফরমার চোর চক্রের সক্রিয় সদস্য।
পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দুই যুবকের প্রকৃত পরিচয় এবং ট্রান্সফরমার চুরির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সেখানে উপস্থিত উত্তেজিত জনতা তাদের চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী চুরির চেষ্টার অপরাধে ওই দুই যুবককে হাতেনাতে আটক করে শক্তভাবে বেঁধে রাখেন। এরপর স্থানীয় জোরারগঞ্জ থানায় বিষয়টি অবহিত করা হয় এবং পুলিশকে দ্রুত ঘটনাস্থলে আসার অনুরোধ জানানো হয়। সংবাদ পাওয়ার পরপরই জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। পুলিশ এসে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে অভিযুক্ত দুই যুবককে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং চুরির কাজে ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জামসহ তাদের থানায় নিয়ে যায়।
ট্রান্সফরমার চুরির এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার সার্বিক অগ্রগতি ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন জোরারগঞ্জ থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম। তিনি গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে বলেন যে, দিনদুপুরে সরকারি ট্রান্সফরমার চুরির চেষ্টার অপরাধে জড়িত থাকা দুই যুবককে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে এবং বর্তমানে তারা থানা হেফাজতে রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরও উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির এই গুরুতর অপরাধের ঘটনায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করার আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততার সাথে চলমান রয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি রুজু করা হবে। মামলার প্রাথমিক তদন্ত ও আইনি নথিপত্র প্রস্তুতের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পরপরই আটককৃত মেহেদী হাসান আকাশ ও সায়েদ শেখকে যথাযথ পুলিশ প্রহরায় বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হবে। একই সাথে এই চোর চক্রের সাথে অন্য কোনো স্থানীয় বা বহিরাগত ব্যক্তি জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ তদন্ত অব্যাহত রাখবে।