খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আফগানিস্তানের তিনটি সীমান্ত প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ১১ জন শিশুসহ অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই আকস্মিক ও বিতর্কিত সামরিক অভিযানে আরও অন্তত ১৪ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যাদের সবাই নারী ও শিশু বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং এর ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বুধবার (১০ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিমান হামলার তথ্য ও হতাহতের পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেছেন। তালেবান প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পাকিস্তানের বিমান বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন ও আফগানিস্তানের আকাশসীমা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এই হামলা চালায়।
হামলার ভৌগোলিক অবস্থান ও লক্ষ্যবস্তুসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:
আক্রান্ত প্রদেশসমূহ: আফগানিস্তানের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত সংলগ্ন কুনার, খোস্ত এবং পাকতিকা—এই তিনটি প্রদেশে একযোগে বিমান হামলা চালানো হয়।
লক্ষ্যবস্তু: তালেবান মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো কোনো সামরিক স্থাপনায় নয়, বরং সম্পূর্ণ বেসামরিক ও আবাসিক এলাকায় বোমাবর্ষণ করেছে।
হতাহতের প্রকৃতি: জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই হামলায় নিহত ও আহত হওয়া প্রত্যেকটি মানুষই সাধারণ আফগান নাগরিক এবং তাদের সাথে কোনো সশস্ত্র বা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সম্পর্ক ছিল না। নিহতদের মধ্যে ১১ জনই অবুঝ শিশু, যা এই হামলার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আফগান আকাশসীমা লঙ্ঘন ও বেসামরিক নাগরিক নিহতের এই গুরুতর ঘটনার পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বা দেশটির সামরিক বাহিনীর (আইএসপিআর) পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। তবে পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে এই অভিযানের নেপথ্য কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু অনানুষ্ঠানিক তথ্য জানিয়েছে।
পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই সামরিক অভিযানটি কোনো সাধারণ নাগরিক বা আফগান জনগণের বিরুদ্ধে ছিল না। মূলত আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে অবস্থানরত এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নাশকতা সৃষ্টিকারী সক্রিয় সন্ত্রাসী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের গোপন আস্তানাগুলো লক্ষ্য করেই এই সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা চালানো হয়েছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে আসছে যে, আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটির মাটিকে ব্যবহার করে পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) বা অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ক্রমাগত প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে এবং তালেবান প্রশাসন তাদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করছে। তবে তালেবান সরকার পাকিস্তানের এই অভিযোগ বরাবরই দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে এবং তাদের দাবি, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ সমস্যা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলার বিষয়।
এই সাম্প্রতিক বিমান হামলার ফলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান ভঙ্গুর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক সময়ে অর্জিত যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে অত্যন্ত তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘাত হয়েছিল। পরবর্তীতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে পরাশক্তি চীনের বিশেষ কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় গত মার্চ মাসে দুই প্রতিবেশী দেশ একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু জুনের এই বিমান হামলা সেই শান্তিপ্রক্রিয়াকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সংকলিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
| সময়কাল | আফগান বেসামরিক নিহত | আফগান বেসামরিক আহত |
| চলতি বছরের প্রথম তিন মাস (জানুয়ারি – মার্চ) | অন্তত ৩৭২ জন | অন্তত ৩৯৭ জন |
জাতিসংঘের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দুই দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক অনমনীয়তার কারণে সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিমান হামলার পর সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনী উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।