নগরবাউল জেমস তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রযোজক ফারুক কবির বাদলকে স্মরণ করে বলেছেন, তিনি কেবল একজন সহকর্মী নন, ছিলেন পরিবারেরই একজন সদস্য। সম্প্রতি একটি ফোনকলে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন এই জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। তিনি জানান, বাদলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর বন্ধুত্ব, আস্থা ও আত্মিক টান—যা সময়ের পরীক্ষায় আরও দৃঢ় হয়েছে।
জানা যায়, গত ২ মে ফারুক কবির বাদলের মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর তিন বছর আগে দেশে ফিরে আসেন তিনি। তবে দেশে ফেরার পরও অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ সীমিত ছিল তাঁর। শেষ জীবনে তিনি ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে একা বসবাস করতেন।
সংগীত যাত্রার সূচনা ও সাফল্য
জেমস ও বাদলের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সংগীত জগতে একসঙ্গে পথচলার মধ্য দিয়ে। নব্বইয়ের দশকে সারগাম স্টুডিও তাঁদের সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ১৯৮৯ সালে এই স্টুডিও থেকেই প্রকাশ পায় জেমসের প্রথম একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’। এরপর ১৯৯৩ সালে আসে দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘জেল থেকে বলছি’। এই দুটি অ্যালবাম শুধু তাঁকে জনপ্রিয়তাই এনে দেয়নি, বরং বাণিজ্যিকভাবেও ব্যাপক সফলতা অর্জন করে।
তবে জেমসের ভাষায়, এই সাফল্যের চেয়ে বড় ছিল বাদলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে ছিল আড্ডা, গল্প, অভিমান আর বন্ধুত্বের এক অটুট বন্ধন, যা সংগীতের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ বিচ্ছেদ ও আকস্মিক পুনর্মিলন
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সংগীত শিল্পের পরিবর্তনের কারণে বাদল ধীরে ধীরে প্রযোজনার মূলধারা থেকে সরে যান এবং এক পর্যায়ে বিদেশে চলে যান। প্রায় সাতাশ বছর পর দেশে ফেরার পরও তিনি অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতেন।
তবে ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট এক আকস্মিক ঘটনায় তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হয় গীতিকার বাপ্পী খানের। উত্তরায় এক পারিবারিক প্রয়োজনে গিয়ে বাপ্পী বাদলের মুখোমুখি হন। প্রথমে তাঁকে চিনতে না পারলেও পরে বাদলের পরিচয় পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাপ্পী।
এরপর বাপ্পী তাঁর একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন, তবে বাদলের অনুরোধে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ তথ্য প্রকাশ করেননি। এই ছবির মাধ্যমেই জেমস পুনরায় বাদলের খোঁজ পান।
শেষ যোগাযোগ ও স্মৃতির মুহূর্ত
জেমস তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে দুবাইয়ে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তিনি বাপ্পীর পোস্ট দেখে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বাদলের খোঁজ নেন। এরপর বাপ্পীর কাছ থেকে নম্বর নিয়ে বাদলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন জেমস।
প্রায় দশ মিনিটের সেই ফোনকলে তারা পুরোনো দিনের মতো হাসাহাসি ও স্মৃতিচারণ করেন। বহু বছর পর এই যোগাযোগকে জেমস এক অসাধারণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, কথোপকথনের বিস্তারিত তিনি ব্যক্তিগত রাখতে চান, তবে সেই মুহূর্তটি তাঁর জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
মৃত্যুর সংবাদ ও শেষ বিদায়
২৮ এপ্রিল প্রতিবেশীরা শেষবারের মতো বাদলকে জীবিত দেখেন। এরপর ২ মে তাঁর ফ্ল্যাট থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৩ মে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
জেমস বলেন, বাদলের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তিনি মনে করেন, বাদল ছিলেন শুধু একজন বন্ধু নন, বরং তাঁর পরিবারেরই একজন অংশ। সংগীত জগতে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যা পুরো শিল্পাঙ্গন গভীরভাবে অনুভব করছে।
গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা
তারিখ
ঘটনা
১৯৮৯
‘অনন্যা’ অ্যালবাম প্রকাশ
১৯৯৩
‘জেল থেকে বলছি’ অ্যালবাম প্রকাশ
২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট
দীর্ঘদিন পর বাদলের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাৎ
২৮ এপ্রিল
শেষবার জীবিত দেখা যায়
২ মে
মরদেহ উদ্ধার
৩ মে
বনানী কবরস্থানে দাফন
জেমসের ভাষায়, বাদলের শূন্যতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং পুরো সংগীত অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।