খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
রাজধানীর রামপুরায় নিজ বাসভবনের সামনে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের অতর্কিত গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ (৫০)। অপরাধ জগতে তিনি ‘কাইল্লা পলাশ’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত। আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট ও মাস্ক পরিহিত দুই ব্যক্তি অত্যন্ত কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি ছোড়ে। দুর্বৃত্তদের ছোড়া দুটি গুলিই তাঁর মাথায় বিদ্ধ হয়। ঘটনার পর রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হলেও পলাশের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা।
পুলিশ ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম রামপুরার টেলিভিশন সেন্টারের ঠিক বিপরীত পাশে অবস্থিত ‘খান টাওয়ার’ নামক একটি বহুতল ভবনের সপ্তম তলায় সপরিবারে বসবাস করতেন ইয়াসিন খান পলাশ। আজ শুক্রবার দুপুরে তিনি বাসার পাশের মক্কি জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন এবং নামাজ শেষে সেখানে আয়োজিত একটি মিলাদ মাহফিলেও অংশ নেন। মিলাদ শেষে তিনি নিজ বাসার সামনে এসে রয়েল মিষ্টির দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে পরিচিত কয়েকজন স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ঠিক এই সময়ে সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া হেলমেট ও মাস্ক পরিহিত দুই অজ্ঞাতপরিচয় যুবক অত্যন্ত কাছ থেকে আচমকা তাঁকে লক্ষ্য করে পিস্তল থেকে গুলি ছোড়ে।
পলাশের বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ইব্রাহিম মিয়া ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, দুই যুবক অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় খুব কাছ থেকে পলাশের মাথায় গুলি করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার পরপরই দুই হামলাকারী কিছু দূরে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা একটি মোটরসাইকেলে দ্রুত আরোহণ করে হাতিরঝিলের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ওই সময় পলাশের সঙ্গে থাকা স্থানীয় লোকজন সাহসিকতার সাথে বন্দুকধারীদের ধাওয়া দিলে চারদিকে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে হামলাকারীরা শূন্যে আরও দুটি গুলি ছোড়ে। এরপর তারা দ্রুত মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। নিরাপত্তাকর্মী ইব্রাহিম মিয়া আরও তথ্য দেন যে, প্রায় এক মাস আগে পলাশ দীর্ঘদিন কারাবাসের পর জামিনে মুক্ত হয়ে বাসায় ফিরেছিলেন।
গুরুতর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ইয়াসিন খান পলাশকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করে ভর্তি করা হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের পরামর্শে দ্রুত নিউরোসার্জারি বিভাগে নেওয়া হয় এবং সন্ধ্যার দিকে তাঁর মাথায় একটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের রেসিডেন্ট ট্রেইনি চিকিৎসক তারিকুল ইসলাম পলাশের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা ও অস্ত্রোপচারের বিষয়ে জানান, অস্ত্রোপচার চলাকালীন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চিকিৎসকেরা তাঁর মাথার ভেতর থেকে একটি গুলি বের করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে অপর গুলিটি তাঁর মাথা ও শরীর ভেদ করে সরাসরি বের হয়ে চলে গেছে। গুলির তীব্র আঘাতে তাঁর মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সফল অস্ত্রোপচার শেষে বর্তমানে পলাশকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ও আশঙ্কাজনক।
ভয়াল এই হামলার ঘটনার পরপরই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), থানা-পুলিশ এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ (সিআইডি) বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, জুমার নামাজ শেষে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা পলাশকে গুলি করে পালিয়ে যায়। কারা এবং ঠিক কী কারণে এই নৃশংস হামলা চালিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের সড়কগুলো থেকে বেশ কয়েকটি সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন স্থানীয় ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুরনো বিরোধের জেরে এই পরিকল্পিত হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পলাতক ও অবস্থানরত দেশের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে ইয়াসিন খান পলাশের তীব্র বিরোধ ছিল। সম্প্রতি কারামুক্তির পর পলাশ রামপুরা এলাকায় নতুন করে বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা ও নিজের পুরনো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন। এই কারণে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো অপরাধী চক্র এই হামলার পেছনে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই বিষয়ে নিশ্চিত করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি পুলিশ কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য, চাঞ্চল্যকর এই হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি।