খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলায় একটি মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক আলোচনা সভা ও মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে মাদক কারবারিদের সহিংস হামলার শিকার হয়েছেন দুই যুবক। এই অতর্কিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনায় দুই তরুণ গুরুতরভাবে আহত এবং রক্তাক্ত জখম হয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে কালিয়াকৈর উপজেলার চাপাইর ইউনিয়নের অন্তর্গত সাতকুড়া এলাকায়। ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় হামলাকারী পরিবারের তিন সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে এবং পুলিশ তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার চাপাইর ইউনিয়নের সাতকুড়া এলাকাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করার দৃঢ় লক্ষ্যে স্থানীয় সমাজ সচেতন বাসিন্দাদের উদ্যোগে শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে একটি মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করা হয়। ওই সামাজিক প্রতিরোধ সভায় সাতকুড়া এবং এর আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের শতাধিক সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। আলোচনা সভা শেষে মাদকবিরোধী একটি সচেতনতামূলক মিছিলও বের করা হয়।
মিছিল ও সভা শেষ করে সন্ধ্যার দিকে অংশগ্রহণকারীরা যখন নিজ নিজ বাড়ি ফিরছিলেন, ঠিক তখনই একদল মাদক কারবারি পূর্বপরিকল্পিতভাবে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায়। হামলাকারীরা রামদা, রড, চাপাতি ও ধারালো দা নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে। তাদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন উপজেলার জাথালিয়া গ্রামের হাফিজ উদ্দিনের ছেলে নাঈম ইসলাম (২০) এবং একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে সাদ্দাম হোসেন (২২)। মাদক কারবারিরা এই দুই যুবককে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় ওই দুই যুবক মাটিতে লুটিয়ে পড়লে পুরো সাতকুড়া এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং আহতদের উদ্ধার করেন। প্রথমে রক্তাক্ত অবস্থায় নাঈম ও সাদ্দামকে কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে দুজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ড. হুমায়ুন কবিরের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর (রেফার্ড) করা হয়।
এদিকে হামলার ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় সাধারণ জনতা ধাওয়া করে হামলার মূল হোতা চান মিয়াকে (৬০) ধরে ফেলেন। পরবর্তীতে তাঁর সহযোগী ও পরিবারের অপর দুই সদস্য—তাঁর স্ত্রী আছিয়া বেগম (৫০) এবং পুত্রবধূ শিল্পী আক্তারকে (২৫) আটক করা হয়। কালিয়াকৈর থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং উত্তেজিত এলাকাবাসী আটককৃত তিনজনকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। তবে ঘটনার সাথে জড়িত চান মিয়ার ছেলে আওলাদ ও তাদের পিতা পরান আলীসহ পরিবারের অন্য কয়েকজন সদস্য সুযোগ বুঝে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, হামলার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল সাতকুড়ায় পৌঁছায়। তারা পরিস্থিতি শান্ত করে এবং জড়িত থাকার অভিযোগে এক নারীসহ তিনজনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পুলিশ জানায়, আটককৃতদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক কেনাবেচা এবং মাদক সেবনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার পর রাতেই পুলিশ আসামিদের বাড়িতে বিশেষ অভিযান ও তল্লাশি চালিয়ে বেশ কিছু মাদকদ্রব্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
ওসি সহিদুল ইসলাম আরও নিশ্চিত করেন যে, এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগী ও আহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে শুক্রবার রাতেই কালিয়াকৈর থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দায়েরকৃত মামলার ভিত্তিতে আটক চান মিয়া, আছিয়া বেগম এবং শিল্পী আক্তারকে শনিবার (১৩ জুন) সকালে আদালতের মাধ্যমে গাজীপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে, মাদকবিরোধী সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অপরাধে যুবকদের ওপর মাদক কারবারিদের এমন নৃশংস হামলার ঘটনায় স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী সাতকুড়া ও কালিয়াকৈরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাদকের স্থায়ী নির্মূল এবং পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর ও কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।