খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিপ্লবী, লাতিন আমেরিকার সংগ্রামী চেতনার প্রতীক চে গুয়েভারা-এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো আজও ইতিহাস, কিংবদন্তি ও বিতর্কের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কথিত আছে, মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা চে’র শেষ কথাগুলোর এঢ়কটি ছিল—
“গুলি কোরো না। আমি চে গুয়েভারা। মৃত চে গুয়েভারার চেয়ে জীবিত চে গুয়েভারা তোমাদের জন্য বেশি মূল্যবান।”
মার্কিন সংবাদপত্র The Washington Post-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তাঁর বন্দিত্ব ও মৃত্যুর শেষ অধ্যায়ের এমন বর্ণনা উঠে আসে।
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর। বলিভিয়ার দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের এক পর্যায়ে হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ হন চে। আরেকটি গুলিতে হাত থেকে ছিটকে পড়ে তাঁর রাইফেল। চারদিক থেকে সৈন্যরা তাঁকে ঘিরে ফেললে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
আর্জেন্টিনার এক তরুণ চিকিৎসক থেকে বিশ্ববিপ্লবের প্রতীকে পরিণত হওয়া এই মানুষটি তখনও মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়েছিলেন।
কিউবার বিপ্লবে ফিদেল কাস্ত্রো-এর অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি। কাস্ত্রোর বিজয়ের পর কিউবার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ক্ষমতা বা পদ তাঁর লক্ষ্য ছিল না। তাঁর স্বপ্ন ছিল সীমান্ত পেরিয়ে শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে ছড়িয়ে দেওয়া। সেই স্বপ্নই তাঁকে আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অরণ্যে নিয়ে যায়।
বলিভিয়ায় একটি গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন নিয়েই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মাটিতেই শেষ হয় তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ বিস্ময়কর জীবনযাত্রা।
গ্রেপ্তারের পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বলিভিয়ার ছোট্ট শহর লা হিগুয়েরার একটি এককক্ষবিশিষ্ট বিদ্যালয়ে। সেখানে হাত-পা বাঁধা, ছেঁড়া ও ময়লাযুক্ত পোশাকে বন্দি অবস্থায় তাঁকে দেখতে পান নিজেকে বলিভীয় সেনা পরিচয় দেওয়া সিআইএ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজ।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহল চে’কে জীবিত অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু বলিভিয়ার শাসকগোষ্ঠী আশঙ্কা করেছিল, প্রকাশ্য বিচার হলে তিনি আরও বড় জননায়কে পরিণত হবেন। তাই তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রদ্রিগেজ বলেন—
“আমি তাঁর চোখের দিকে তাকালাম। তিনিও আমার দিকে তাকালেন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘এটাই ভালো। আমি কখনো ভাবিনি জীবিত অবস্থায় ধরা পড়ব।’”
ইতিহাসের এক অদ্ভুত মুহূর্ত—শত্রু ও বন্দি করমর্দন করলেন, এমনকি আলিঙ্গনও করলেন। অথচ কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা।
সাংবাদিক ও জীবনীকার জন লি অ্যান্ডারসন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Che Guevara: A Revolutionary Life-এ উল্লেখ করেছেন, চে’কে গুলি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সার্জেন্ট জাইমে তেরানকে।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চে নাকি বলেছিলেন—
“আমি জানি তুমি আমাকে হত্যা করতে এসেছ। গুলি করো। তুমি কেবল একজন মানুষকেই হত্যা করতে যাচ্ছ।”
এরপর গুলিতে ঝাঁঝরা করা হয় তাঁর শরীর। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৯ বছর।
মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি চে’র যাত্রা। তাঁর মরদেহ বলিভিয়ার ভ্যালেগ্রান্দে গ্রামের একটি হাসপাতালের ধোয়াঘরের সিঙ্কে প্রদর্শন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই বিখ্যাত আলোকচিত্রগুলো। অনেকের কাছে ছবিগুলো যেন ক্রুশবিদ্ধ খ্রিস্টের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছিল।
পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য তাঁর দুটি হাত কেটে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করা যায়। পরে তাঁকে গোপনে গণকবরে সমাহিত করা হয়।
চে’র মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও তাঁর কিংবদন্তির মৃত্যু ঘটেনি। বরং মৃত্যুর পরই তিনি পরিণত হন বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিপ্লবী স্বপ্নের এক অমর প্রতীকে।
চে’র মৃত্যুসংবাদে আবেগঘন ভাষণে ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন—
“যারা মনে করছে চে গুয়েভারার মৃত্যুর মাধ্যমে তাঁর আদর্শের মৃত্যু হয়েছে, তারা ভুল করছে।”
সময় প্রমাণ করেছে, কথাটি সত্য ছিল।কারণ একজন মানুষকে হত্যা করা সম্ভব, কিন্তু একটি স্বপ্নকে নয়। একটি শরীরকে মাটিচাপা দেওয়া যায়, কিন্তু একটি আদর্শকে নয়।
আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মানুষের কাছে চে গুয়েভারা এক অনির্বাণ প্রেরণার নাম। তাঁর মুখাবয়ব শুধু একটি প্রতিকৃতি নয়, বরং প্রতিরোধের এক বৈশ্বিক প্রতীক।
জন্ম : ১৪ জুন ১৯২৮
মৃত্যু : ৯ অক্টোবর ১৯৬৭
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বিপ্লবী চে গুয়েভারাকে—যিনি মৃত্যুর পরও ইতিহাসের পাতা থেকে নয়, মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামের ভেতর থেকে কথা বলে চলেছেন।