খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
আতিকা নূরী
গণঅভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় পেরিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন সাধারণ মানুষের মনে আশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা অপ্রাপ্তি, চরম বৈষম্য আর অন্যায়ের যে পাহাড় জমেছিল—মানুষ ভেবেছিল সরকার পরিবর্তনের জাদুমন্ত্রে তার সবটুকুর প্রতিকার রাতারাতি হয়ে যাবে। মানুষের এই সীমাহীন ও আবেগঘন প্রত্যাশার বিপরীতে সরকার যদি অন্তত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো মৌলিক ক্ষেত্রে ন্যূনতম সুশাসন নিশ্চিত করতে পারত, তবে আজ জনমনে এই গভীর অনাস্থা ও হতাশার সৃষ্টি হতো না।
যে কাঙ্ক্ষিত অভ্যুত্থানের মূলমন্ত্রই ছিল বৈষম্যহীনতা, সেখানে আজ আইনের শাসন, প্রশাসনিক অখণ্ডতা এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে। মব জাস্টিস (গণপিটুনি), নিরপরাধ মানুষকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা মামলায় হয়রানি এবং নির্বিচারে শারীরিক নির্যাতন বন্ধের যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তা আজ সুদূরপরাহত।
আমরা ভেবেছিলাম নতুন এক বাংলাদেশে পা রাখব। রাজনীতিসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের এক নতুন সূর্যোদয় দেখব। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশ যেন এক উল্টো পথের যাত্রী। এই সুযোগে দেশের কিছু উগ্র চরমপন্থী ও ডানপন্থী গোষ্ঠী নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যারা মধ্যযুগীয় শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে দেশকে একটি অন্ধকার ও প্রগতিহীন জগতে ফিরিয়ে নিতে সদা তৎপর।
সম্প্রতি মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা সভ্য সমাজের পরিপন্থী। মাদকবিরোধী অবস্থানের নামে একশ্রেণীর নব্য উগ্রপন্থী ও অতি-উত্সাহী ব্যক্তি নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। তারা বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো মব জাস্টিসের সংস্কৃতি চালু করেছে। প্রশ্ন জাগে—তবে কি দেশে আইন-আদালতের আর কোনো প্রয়োজন নেই? রাষ্ট্র কেন বিপুল রাজস্ব খরচ করে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা পরিচালনা করছে?
কাউকে মাদক ব্যবসায়ী বা অপরাধী সন্দেহ হলেই একদল মানুষকে উস্কে দিয়ে, তার বৃদ্ধ মায়ের সামনে চোখ-মুখ বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন করা কোন ধরনের যৌক্তিকতা? মাদক নির্মূল অবশ্যই জরুরি, কিন্তু আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, মানুষের মৌলিক মানবাধিকার হরণ করে কোনো সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধ দমন করা যায় না। এটি সমাধান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি।
আজকের বাংলাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ড যেন এক সংক্রামক মহামারির আকার ধারণ করেছে। একটি রাষ্ট্রীয় সমাজে ধর্ষণকে ‘মহামারি’ বলতে গেলে আর কতখানি বীভৎসতার প্রয়োজন? সমাজের যেকোনো স্তরের, যেকোনো বয়সের নারীই আজ এই আতঙ্কে জর্জরিত ও বিপর্যস্ত। এই অন্ধকারের লাগাম টানবে কে?
ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা কেবল আইনের শুষ্ক ধারা দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। সমাজের প্রতিটি স্তরে, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তীব্র সচেতনতার তোলপাড় প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থা ও সমাজ যেন আজ স্থবির। এই ক্ষমতাশালী ধর্ষক ও নিপীড়ক শ্রেণী শুধু যৌন সহিংসতা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তারা প্রমাণ লোপাটের জন্য ভুক্তভোগীকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে এবং মৃতদেহ বিকৃত করছে।
মাগুরার আছিয়া কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের রামিসা—এরা কেবল একেকটি নাম নয়, এরা এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির নির্মম স্মারক। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে নয়নির মতো তরুণীর রহস্যজনক ও পরিকল্পিত মৃত্যুর খবর আমাদের স্তম্ভিত করে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের চার ভাগের এক ভাগও গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় না। চারিদিকে এত হিংসা, অস্থিরতা আর অপরাধপ্রবণতা কেন? কেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত কন্যাসন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মাকে সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠায় দিন পার করতে হবে? বিচারের বাণী এখানে আক্ষরিক অর্থেই নিভৃতে কাঁদছে।
উত্তর যদি জানা না থাকে, তবে শুধু এটুকু বলুন—আছিয়া ও রামিসার পর পরবর্তী শিকার কে? আমি, আপনি, নাকি আমাদের পরের প্রজন্মের কন্যারা?
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি করার চেয়ে সমাজে অপরাধের পক্ষে অজুহাত খোঁজার এক নোংরা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তথাকথিত ধর্মীয় বক্তা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী নারীদের নিয়ে ঘটে যাওয়া প্রতিটি পাশবিক ঘটনায় এক ধরণের কুযুক্তি বা ‘যৌক্তিকতা’ খোঁজার চেষ্টা করেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনের টকশোতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন—চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও আসামির নিজস্ব স্বীকারোক্তি ছাড়া ধর্ষণ প্রমাণিত হয় না! সাথে তিনি যোগ করেন, দেশে শরিয়া আইন চালু হলেই নাকি নারীরা সুরক্ষিত থাকবে।
ধর্ষিতার পোশাক, চলন-বলন বা ধর্মীয় তত্ত্বের দোহাই দিয়ে যারা ধর্ষক ও খুনিদের পরোক্ষ প্রশ্রয় ও মদদ দিচ্ছে, তারা এই অপরাধের সমান অংশীদার। এই মনস্তত্ত্বই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। এটি অবশ্য কোনো একক সরকারের ব্যর্থতা নয়; বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই এমন যে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে শুরু হয় প্রতিশোধের রাজনীতি, সহিংসতা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির করার খেলা।
কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নে নারীর অন্তর্ভুক্তির যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখলাম, তা আমাদের চরমভাবে হতাশ করেছে। নির্বাচনি ট্রেনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল যাতসামান্য। সংসদের প্রধান বিরোধী দল বা অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোতে কোনো নারী প্রার্থীই ছিল না। প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর অংশ নেয়ার ন্যূনতম অধিকারটুকু নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো।
অথচ বাংলাদেশের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে রাজপথে নারীদের বলিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল অনস্বীকার্য। আন্দোলনের প্রথম সারিতে নারী থাকলেও, ক্ষমতার বা নেতৃত্বের মূল জায়গায় কেন এই ভারসাম্যহীনতা?
শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক ও নারী অধিকার কর্মীদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা:
সাইবার বুলিং ও চরিত্র হনন: বর্তমান সময়ে একজন নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা রাজনীতিতে প্রবেশ করার সাথে সাথেই তার বিরুদ্ধে শুরু হয় নোংরা ‘ট্রল’ ও চরিত্র হননের অপচেষ্টা। এই ভয়ে অনেক পরিবার তাদের কন্যাদের রাজনীতিতে আসতে দিতে চায় না।
প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের অভাব: রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের মুখে বড় বড় কথা বললেও সংকটের সময়ে দলের পক্ষ থেকে নারীরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ‘অভয়’ বা ভরসা পান না।
যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দিয়ে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছিল, পরিহাসের বিষয় হলো, তার সমাপনীতে এসে নারীরাই আজ সবচেয়ে বড় বৈষম্যের শিকার।
সমাজ, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ শুধু সমতা বা করুণার প্রশ্ন নয়; বরং এটি একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।
১. প্রতিনিধিত্বের ন্যায্যতা: দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল টেবিলে তাদের অনুপস্থিতি গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত ঘাটতিকেই স্পষ্ট করে। ২. মানবিক ও গুণগত নীতি নির্ধারণ: বৈশ্বিক গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নীতিনির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু ও পরিবার কল্যাণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত আইনগুলোকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত, সংবেদনশীল ও মানবিক করে তোলে।
তাই নারীদের শুধু নামমাত্র অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া নয়; বরং শিক্ষা, বিশেষ রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিচারহীনতার এই অন্ধকার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে, সাধারণ মানুষ ও নারীদের এই অবজ্ঞা ও অবদমন কোনোদিনই ঘুচবে না।
লেখক: নারী অধিকার কর্মী ও কলামিস্ট।