খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদ্য বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জিসান মিয়া প্রধানের কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্ধার ও পরবর্তীতে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ অধিবেশন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে ওই নেতার বিরুদ্ধে আনীত ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের মামলার বিবরণ এবং পুলিশি অভিযানের তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তবে জিসান ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে সেটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ বা এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানিয়েছে বিরোধী দল। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের সংসদ সদস্যদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও হট্টগোল তৈরি হয়।
রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলাকালে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের অনুমতি নিয়ে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিবৃতি দিতে দাঁড়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি তাঁর বক্তব্যের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদকে অবহিত করেন যে, দুর্নীতির মামলায় দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর ঘোষণার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আকস্মিকভাবে ছাত্রশিবিরের সদ্য বহিষ্কৃত নেতা জিসান মিয়া প্রধানের গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গটি সংসদের সামনে উত্থাপন করেন, যা অধিবেশনে নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ছাত্রশিবিরের সাবেক এই নেতার বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিবরণ দিয়ে সংসদে বলেন, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে এক বিধবা নারীর সঙ্গে জিসানের পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্কের একপর্যায়ে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান তার ওপর গর্ভপাতের জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ওই নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানো হয়। এই কাজে জিসানের চাচাতো ভাই রাসেল আহমেদ একটি ফার্মেসি বা দোকান থেকে ওষুধ এনে সরাসরি সহযোগিতা করেন বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, গত ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) জিসান ওই নারীকে বিয়ে না করার এবং আইনি জটিলতা এড়ানোর টালবাহানায় নিজেই ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মগোপনে চলে যান। একই সাথে বিষয়টি ভিন্ন খাতে মোড় নিতে জিসানের চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে স্থানীয় থানায় একটি নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করান। পুলিশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে নিবিড় অনুসন্ধান শুরু করে এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় কুমিল্লা লাকসাম এলাকা থেকে জিসানকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে। জিসান উদ্ধারের খবর পেয়ে ভুক্তভোগী ওই নারী বাদী হয়ে কুমিল্লা দাউদকান্দি মডেল থানায় জিসানকে প্রধান আসামি করে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দীর্ঘ বক্তব্যের পর সংসদে তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। স্পিকারের অনুমতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার শুরুতে তিনি সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গ্রেপ্তারের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান। তবে অবিলম্বে শিবির নেতার ব্যক্তিগত অপরাধের প্রসঙ্গ সংসদে তোলায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “একটি চলমান ও তদন্তাধীন ফৌজদারি অপরাধের বিষয় এভাবে সংসদে তুলতে দেওয়া মোটেও উচিত হয়নি। একটি সাধারণ মামলা বা বিতর্কিত বিষয় এভাবে জাতীয় সংসদে তোলা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এটিই প্রথম।”
তখন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল মন্তব্য করেন যে, এই বিষয়টি তাঁর আগে থেকে জানা ছিল না, যেমন প্রথম (বেনজীর আহমেদের) বিষয়টিও তাঁর জানা ছিল না। পরে বিরোধীদলীয় উপনেতা অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই প্রসঙ্গটি সংসদে আনা হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে জিসান প্রসঙ্গে এই বক্তব্য দিয়েছেন, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা।
এ সময় ডা. আবদুল্লাহ তাহের জানতে চান, জিসান বর্তমানে ঠিক কোথায় আছে? জিসানকে বা ভুক্তভোগী মেয়েটিকে কারো সঙ্গে বা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না কেন? এখানে কোনো রাজনৈতিক প্লট তৈরি করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তিনি তোলেন। কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল তা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, অথচ এমন অনেক অপরাধের ঘটনা দেশজুড়ে ঘটলেও শুধু এটিই বেছে বেছে সংসদে তোলা হলো। তিনি অবিলম্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া জিসানসংক্রান্ত বক্তব্যটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে সম্পূর্ণ বাদ বা এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান।
ডা. আবদুল্লাহ তাহেরের এই দাবির পর বিরোধী দলের সকল সংসদ সদস্য নিজ নিজ আসন থেকে ক্ষোভে দাঁড়িয়ে যান। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জবাব দেওয়ার জন্য নিজের আসনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিরোধীদলীয় উপনেতাকে বক্তব্য থামাতে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বারবার নিজ আসনে বসে পড়ার অনুরোধ জানালেও উভয় পক্ষই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় সংসদে চরম উত্তেজনা ও হট্টগোল তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ডেপুটি স্পিকার রুলিং দিয়ে জানান, কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধির আওতায় প্রদত্ত সরকারি বিবৃতির ওপর সাধারণত তাৎক্ষণিক কোনো প্রশ্ন করা বা দীর্ঘ বিতর্ক করার সুযোগ থাকে না। তবে সংসদীয় নিয়ম মেনে স্পষ্টীকরণের জন্য সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করা যেতে পারে। তিনি উভয় পক্ষের সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানান। ডেপুটি স্পিকার স্পষ্ট রুলিং দেন যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রদত্ত বক্তব্য যদি সংসদীয় রীতির বাইরে বা অবমাননাকর প্রমাণিত হয়, তবে তা কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী এক্সপাঞ্জ করা হবে। ডেপুটি স্পিকারের এই কঠোর নির্দেশনার পর দীর্ঘ সময় পর উভয় পক্ষ আসনে বসলে সংসদের পরবর্তী স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়।