খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে তুরস্কের বিপক্ষে ২-০ গোলের ঐতিহাসিক জয়ের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে শরণার্থীশিবির থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ানো অস্ট্রেলিয়ার দুই তরুণ ফুটবলারের জীবনসংগ্রামের গল্প। অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে বিখ্যাত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ বা সোনালি প্রজন্ম বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নাম উজ্জ্বল করার ঠিক ২০ বছর পর, চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে সকারুজদের প্রচারণার প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন দুই আফ্রিকান শরণার্থী। ২০ বছর বয়সী নেস্টোরি ইরানকুন্ডা এবং ২২ বছর বয়সী মোহামেদ তুরে এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও উদীয়মান দুই প্রতিভার নাম। তুরস্কের বিপক্ষে অজিদের গৌরবময় জয়ের প্রথম গোলটি এসেছে নেস্টোরি ইরানকুন্ডার পা থেকেই।
এই দুই তরুণ ফুটবলারের জীবন ও ক্যারিয়ারের মাঝে গভীর মিল রয়েছে। দুজনেই শৈশবে আফ্রিকা থেকে শরণার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। ইরানকুন্ডার পরিবার তানজানিয়া থেকে এবং তুরের পরিবার গিনি থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসে। পরবর্তীতে দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার ক্লাব অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের যুব একাডেমি থেকে ফুটবলার হিসেবে গড়ে ওঠেন। বর্তমানে এই দুই উদীয়মান বন্ধুই ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ফুটবল লিগের দ্বিতীয় স্তর তথা ইংলিশ ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়নশিপে পেশাদার ফুটবল খেলছেন।
বিশ্বজুড়ে যখন অভিবাসী-বিরোধী স্লোগান ও রাজনৈতিক জটিলতা তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই এই দুই তরুণ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত অস্ট্রেলিয়ার ২৬ সদস্যের বর্তমান স্কোয়াডটি মূলত ১৫টি ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পটভূমি থেকে আসা খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত। মাঠের এই দলটি আসলে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতি তিনজন নাগরিকের মধ্যে একজনের জন্ম দেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে।
নিজের অদম্য শারীরিক শক্তি এবং বিদ্যুৎগতির জন্য পরিচিত মোহামেদ তুরে এবারের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার মূল স্ট্রাইকার বা ‘লিড ফরোয়ার্ড’ হিসেবে খেলছেন। ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব নরউইচ সিটির হয়ে ২০ Dismাস-২৬ মৌসুমে মাত্র ১১ ম্যাচে ৯ গোল করে এক অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ার পার করেছেন তিনি। তুরের জন্ম হয়েছিল গিনির রাজধানী কোনাক্রির একটি শরণার্থীশিবিরে। লাইবেরিয়ার ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ থেকে জীবন বাঁচাতে তার বাবা-মা দীর্ঘ ১৪ বছর সেই শিবিরে কাটিয়েছিলেন। তুরের বয়স যখন মাত্র সাত মাস, তখন তারা শরণার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আশ্রয় পান।
তুরের কাছে সকারুজদের এই সবুজ-হলুদ জার্সি গায়ে জড়ানো মানে এক পরম ‘স্বাধীনতা’। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন:
“অস্ট্রেলিয়া এমন এক দেশ যা আমাদের সুযোগ দিয়েছে, আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন শরণার্থী হিসেবে আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে আমার ক্যারিয়ারের গ্রাফ আমাকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাবে কিংবা আমি নরউইচ সিটির মতো ক্লাবের হয়ে খেলব।”
ইরানকুন্ডার কাছে এটা এখনো এক অবিশ্বাস্য ঘোর যে অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি উন্নত দেশে তাদের মতো কৃষ্ণাঙ্গ তরুণরা আজ ফুটবলের প্রধান মুখ বা ‘পোস্টার বয়’ হয়ে উঠছে। অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, “এটা ভাবলেই পাগলামি মনে হয়, কারণ কে এটা কখনো ভেবেছিল? এখন যখন এটা সত্যিই ঘটছে, সবাই অবাক হয়ে বলছে, ‘ওয়াও’। আমি নিজেও কখনো ভাবিনি এটা সম্ভব হবে, হয়তো কোনো এক দিন হতো, কিন্তু এত দ্রুত হবে তা ভাবিনি।”
নিজের জীবনের আদর্শ বা হিরোকে নিয়ে ইরানকুন্ডা জানান, তার বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে তিনি যার খেলা দেখে অনুপ্রেরণা খুঁজতেন, তিনি হলেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার টিম কাহিল। কাহিল সামোয়ান পটভূমির (আধা-কৃষ্ণাঙ্গ) হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ইরানকুন্ডা তাকে আইডল মানতেন, বিশেষ করে তার আক্রমণাত্মক খেলার ধরন। ইরানকুন্ডা বলেন, “আজ পর্যন্ত ওনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, তবে ওনার সঙ্গে দেখা করা এবং একটা দীর্ঘ আড্ডা দেওয়া আমার জীবনের অন্যতম বড় একটা স্বপ্ন। কী অসাধারণ একজন খেলোয়াড় ছিলেন তিনি, এককথায় টপ প্লেয়ার!” ইরানকুন্ডার জন্ম হয়েছিল তানজানিয়ার এক শরণার্থীশিবিরে, তার বাবা-মা ছিলেন বুরুন্ডির নাগরিক। পরে একেবারে শিশু বয়সে তারা অস্ট্রেলিয়ায় এসে স্থায়ী হন।
তুরে এবং ইরানকুন্ডা দুজনই তাদের আরেক সতীর্থ আওয়্যার মাবিলের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ‘গেমচেঞ্জিং টিম’-এর সদস্য। এটি মূলত বাস্তুচ্যুত বা শরণার্থী ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা বিশ্বমানের ফুটবলারদের নিয়ে গড়া এক প্রতীকী বিশ্ব একাদশ। মাবিল নিজেও কেনিয়ার এক শরণার্থী শিবিরে দক্ষিণ সুদান থেকে আসা দম্পতির ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের হয়ে খেলেছেন।
চলতি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলে আফ্রিকান ঐতিহ্যের অধিকারী মোট ছয়জন সকারুজ স্থান পেয়েছেন। তুরে (গিনি ও লাইবেরিয়া) ও ইরানকুন্ডা (তানজানিয়া ও বুরুন্ডি) ছাড়াও দলে খেলছেন লুকাস হ্যারিংটন (জিম্বাবুয়ে), জেসন গেরিয়া (উগান্ডা) এবং আওয়্যার মাবিল ও তেতে ইয়েনগি (দুজনেই দক্ষিণ সুদান)। ইরানকুন্ডা বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেন, “আফ্রিকান ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা আমরা সবাই যে আজ এখানে একসঙ্গে জাতীয় দলে খেলছি, এটা ভাবতেই দারুণ লাগে। এটা আমাদের পুরো আফ্রিকান কমিউনিটির জন্যই এক বিশাল গর্বের ব্যাপার।”