খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর সদ্য নিযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহির হোসেন ব্যাংকের গ্রাহক ও আমানতকারীদের গত দুই সপ্তাহের অস্থিরতা কাটিয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়াই ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “কোনো দ্বিধা ছাড়াই আপনাদের লেনদেন চালিয়ে যান এবং ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখুন।”
শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন বর্তমানে রূপান্তরকালীন সময়ে ব্যাংকের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম বজায় রাখতে সাময়িকভাবে এক সদস্যের বোর্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি যোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। একটি যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাঁচ সদস্যের একটি নতুন বোর্ড গঠন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি আমানতকারীদের ব্যাপক অর্থ উত্তোলন, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে গত রবিবার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন সম্পূর্ণ পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশিদ আলমকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল।
বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুককে পদে পুনর্বহালের দাবি জানানো হলেও অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান তা নাকচ করে দিয়েছেন। মোহাম্মদ জহির হোসেন স্পষ্ট করেন যে, মো. ওমর ফারুকের পদত্যাগপত্র ইতিমধ্যে গৃহীত হওয়ায় তাঁকে পদে ফিরিয়ে আনার কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
১ জুন থেকে খুরশিদ আলমের নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসা ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ (Conscious Customers Forum) পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তাদের “প্রাথমিক বিজয়” হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফোরামের প্রতিনিধি নূর নবী মানিক সততা, যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠন এবং পূর্ববর্তী মালিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক নেওয়া শেয়ার ফেরত দেওয়াসহ একটি ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। এই দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। এবিবি-এর চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন এক বিবৃতিতে এই পদক্ষেপকে সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, ১০ জুন তাঁরা গভর্নরকে ব্যাংকের পদ্ধতিগত গুরুত্ব ও সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল ইসলামী ব্যাংককে ২,৫০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য সহায়তা প্রদান করেছে। ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী দিনগুলোর তুলনায় অর্থ উত্তোলনের চাপ অনেকটাই কমে এসেছে এবং একটি প্রধান শাখায় হিসাব বন্ধের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
সম্প্রতি বন্ধ বা মেয়াদপূর্তির আগে নগদায়ন করা আমানত হিসাবগুলো পুনরায় সচল করতে ব্যাংক একটি অভ্যন্তরীণ সার্কুলার জারি করেছে। নিচে এই সংক্রান্ত সময়সীমা ও নির্দেশনাবলী টেবিল আকারে দেওয়া হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | নির্দিষ্ট তথ্য ও নির্দেশনাবলী |
| আক্রান্ত হিসাবের ধরণ | এমটিডিআর (MTDR), এমএসবি (MSB), এমএমপিডিএস (MMPDS) এবং এমএসএস (MSS)। |
| হিসাব বন্ধের সময়কাল | ১ জুন থেকে ১৫ জুনের মধ্যে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় হওয়া হিসাবসমূহ। |
| পুনরায় সচল করার সময়সীমা | আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনের ভিত্তিতে। |
| ব্যাংকের বিশেষ নির্দেশনা | মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মাধ্যমে গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ করে লেনদেনে উৎসাহিত করা। |
| পুনরায় সচলের সুবিধা | সচল হওয়ার পর হিসাবগুলো পূর্বের ন্যায় সকল নিয়মিত সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হবে। |
| বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা | ব্যাংকের নগদ প্রবাহ বজায় রাখতে গতকাল প্রদত্ত ২,৫০০ কোটি টাকা। |
ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে যে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে সাময়িক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যেসব গ্রাহক টাকা তুলে নিয়েছিলেন, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া এবং নতুন নিরপেক্ষ পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের আস্থা দ্রুত ফিরে আসবে।