খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
পটুয়াখালী জেলায় সাড়ে ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ৫৫টি সেতু ও সাতটি সড়কের উন্নয়নকাজ বিগত ২২ মাস ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। কোথাও মূল সেতুর কাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়নি, আবার কোথাও সড়কের ওপর সুরকি ও বালু ফেলে রেখে দিনের পর দিন কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক দেশত্যাগ করায় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
ঠিকাদারি জটিলতা ও ব্যাংক হিসাব জব্দ
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ২২টি প্যাকেজের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এসব উন্নয়নকাজের মূল ঠিকাদার ছিল পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ইফতি-ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেড’। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মহিউদ্দিন মহারাজ দেশত্যাগ করেন। এরপর একই বছরের ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) মহিউদ্দিন মহারাজ ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। এর ফলে আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে স্থানীয় সাব-ঠিকাদারেরা কাজ বন্ধ করে দেন। এছাড়া রাজনৈতিক কারণে কয়েকজন সাব-ঠিকাদার এলাকা ছাড়ায় অনেকগুলো কাজ পুরোপুরি থমকে যায়।
উপজেলা ও খাতভিত্তিক বরাদ্দ
২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ (বিডিআইআরডব্লিউএসপি), দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প (আইবিআরপি), উপজেলা শহর (পৌরসভা ছাড়া) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (ইউটিএমআইডিপি) এবং অনূর্ধ্ব–১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের (ইউএইচবিপি) আওতায় এই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। ২২টি প্যাকেজে মোট বরাদ্দ ছিল ৭৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
উপজেলা ও খাতভিত্তিক কাজের বিবরণ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| উপজেলার নাম | প্রকল্পের ধরন ও বিবরণ | প্রাক্কলিত ব্যয় (টাকা) |
| সদর উপজেলা | ১৯টি গার্ডার ও আয়রন সেতু, বক্স কালভার্ট এবং সংযোগ সড়ক | ১৬ কোটি ২৫ লাখ ৪ হাজার |
| সদর উপজেলা | ৯.৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন | ২১ কোটি ৩৪ লাখ ৬৩ হাজার |
| গলাচিপা | ৭টি গার্ডার ও আয়রন সেতু | ৫ কোটি ৩০ লাখ |
| গলাচিপা | ৩.৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন | ৬ কোটি ৯৩ লাখ ৭০ হাজার |
| কলাপাড়া | ৫টি সেতু নির্মাণ | Count ৭ কোটি ২৯ লাখ ৬২ হাজার |
| মির্জাগঞ্জ | ২০টি সেতু নির্মাণ | ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার |
| রাঙ্গাবালী | ৪টি সেতু নির্মাণ | ৬ কোটি ৫৩ লাখ |
| দুমকি | ১.৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন | ১ কোটি ৯১ লাখ |
| সর্বমোট | ৫৫টি সেতু ও ৭টি সড়ক উন্নয়ন | ৭৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার |
কাজের ভৌত অগ্রগতি
এলজিইডির নথিপত্র অনুযায়ী, কাজ বন্ধ হওয়ার পূর্বে সাতটি সড়ক উন্নয়নকাজের গড় ভৌত অগ্রগতি ছিল ৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে একটি সড়কে সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ এবং একটিতে সর্বনিম্ন ২৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। বাকি সড়কগুলোর অগ্রগতি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, সেতু নির্মাণকাজের গড় অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে কোথাও কোথাও সেতুর মূল কাঠামো শতভাগ শেষ হলেও সর্বনিম্ন অগ্রগতি গলাচিপায় ৬০ শতাংশ। বাকি সেতুগুলোর কাজ ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে কলাপাড়া, গলাচিপা, সদর ও রাঙ্গাবালী উপজেলায় সংযোগ সড়ক না করায় নির্মিত সেতুগুলো কোনো কাজে আসছে না।
জনদুর্ভোগ ও বর্তমান পরিস্থিতি
সড়কগুলোর উন্নয়নকাজ অসমাপ্ত থাকায় কোথাও শুধু ইটের খোয়া বিছিয়ে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও দুই পাশে মাটি কেটে গর্ত সৃষ্টি করা হয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসের বৃষ্টিতে এসব গর্তে পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে যানবাহন চলাচল বন্ধসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের পায়ে হেঁটে চলাচলের ক্ষেত্রেও চরম বিপদ ও ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের সিপাইবাড়ি-সংলগ্ন খালের ৩০ মিটার দীর্ঘ আয়রন সেতুটির কাজ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হোসেন আলী মীর আমাদের প্রতিনিধি -কে জানান, আর্থিক লেনদেন বন্ধ হওয়ার পর সাব-ঠিকাদারেরা বকেয়া বিল ও জটিলতা নিরসনের দাবিতে আদালতে মামলা করেছেন। আইনি জটিলতার কারণে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল বা নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। আদালত ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এলে দ্রুত প্রকল্পগুলো শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অন্যদিকে সাব-ঠিকাদার আবুল কালাম আজাদ জানান, মূল ঠিকাদারের ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ায় এলজিইডির সঙ্গে লেনদেন বন্ধ রয়েছে এবং তাঁরাও বিষয়টির দ্রুত আইনি সমাধান আশা করছেন।