খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
খবরওয়ালা ডেস্ক: মানুষের স্বাস্থ্যসেবার শেষ আশ্রয়স্থল হাসপাতাল। বর্তমানে সারা বিশ্বে আনুমানিক ১ দশমিক ৭ মিলিয়নেরও বেশি হাসপাতাল রয়েছে। বিশ্বজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে থাকে। কিছু হাসপাতাল আকারে ছোট এবং সেবার পরিধি সীমিত হলেও, কিছু হাসপাতাল বিশাল আকারের এবং সেখানে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধাও অনেক বেশি। শয্যাসংখ্যার ভিত্তিতে ওয়ার্ল্ডঅ্যাটলাস বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১০টি হাসপাতালের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। মজার ব্যাপার হলো, এই তালিকায় থাকা ১০টি হাসপাতালের মধ্যে ৬টিই এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত। বাকি হাসপাতালগুলো আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশে রয়েছে। চলুন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতালগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক—
১. ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হসপিটাল অব ঝেংঝৌউ ইউনিভার্সিটি (চীন)
শয্যাসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত ‘ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হসপিটাল অব ঝেংঝৌউ ইউনিভার্সিটি’। চীনের হেনান প্রদেশে অবস্থিত এই হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হেনান প্রদেশের কাইফেং এলাকায় এই হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে এটি হেনান প্রদেশের রাজধানী ঝেংঝৌউয়ের বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তরিত হয়।
এই হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা প্রদানই করে না, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অত্যন্ত উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণাও পরিচালনা করে। এখানে প্রতিবছর ৭৫০ কোটি ইউয়ানেরও (আরএমবি) বেশি রাজস্ব আয় হয়, যা হাসপাতালটিকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী এবং উন্নত সেবা প্রদানে সক্ষম করে তোলে।
২. ওয়েস্ট চায়না মেডিকেল সেন্টার (চীন)
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হাসপাতালও চীনে অবস্থিত। এর নাম ‘ওয়েস্ট চায়না মেডিকেল সেন্টার’। এই হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা ৪ হাজার ৩০০। চেংদু শহরে জিন নদীর তীরে বিশাল এই হাসপাতালটি অবস্থিত। ১৯১৪ সালে পশ্চিমা মিশনারিদের উদ্যোগে ‘ওয়েস্ট চায়না ইউনিয়ন ইউনিভার্সিটি’ নামে এর প্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তীতে ২০০০ সালে এটি সিচুয়ান ইউনিভার্সিটির সঙ্গে একীভূত হয়।
এই হাসপাতালে মোট ২৫টি গবেষণাগার, ৩৬টি ক্লিনিক্যাল বিভাগ এবং ১৫টি মেডিকেল টেকনোলজি বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়াও, ৪৩টি দেশের ১৫০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই হাসপাতালের সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। এটি শুধু চিকিৎসাসেবা প্রদানই করে না, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. ন্যাশনাল সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথ (ফিলিপাইন)
এশিয়ার আরেক দেশ ফিলিপাইনের মান্দালুয়ং শহরে প্রায় ৪৭ হেক্টর জায়গাজুড়ে অবস্থিত ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথ’। শয্যাসংখ্যার ভিত্তিতে এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম হাসপাতাল, যেখানে রয়েছে ৪ হাজার ২০০টি শয্যা। ১৯২৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফিলিপাইনের বিপুলসংখ্যক মানসিক রোগী এবং স্নায়ুরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালটি গড়ে তোলা হয়েছে।
এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার আগে মানসিক ও স্নায়ুরোগে আক্রান্ত রোগীদের পৃথক দুটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হতো। তবে বর্তমানে এটি একটি সমন্বিত ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই হাসপাতালটি শুধু চিকিৎসাসেবাই প্রদান করে না, বরং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
৪. লিংকু চ্যাং গুং মেমোরিয়াল হাসপাতাল (তাইওয়ান)
তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হাসপাতাল হলো ‘লিংকু চ্যাং গুং মেমোরিয়াল হাসপাতাল’। এই হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা ৪ হাজার। তাওইউয়ান সিটির গুইশান ডিস্ট্রিক্টে এর অবস্থান। ১৯৭৮ সালে ‘চ্যাং গুং মেডিকেল ফাউন্ডেশন’ নামক হাসপাতাল নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই হাসপাতালটি বিশেষভাবে পরিচিত তার যকৃৎ প্রতিস্থাপন কার্যক্রমের জন্য। এখানে এ পর্যন্ত হাজারেরও বেশি রোগীর যকৃৎ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বব্যাপী অনন্য খ্যাতি এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, লিংকু চ্যাং গুং মেমোরিয়াল হাসপাতাল আধুনিক চিকিৎসা সেবা, গবেষণা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
৫. আঙ্কারা বিলকেন্ত সিটি হাসপাতাল (তুরস্ক)
তুরস্কের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম হাসপাতাল হলো ‘আঙ্কারা বিলকেন্ত সিটি হাসপাতাল’। আঙ্কারা শহরের চানকায়া এলাকায় অবস্থিত এই হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা ৩ হাজার ৮১০টি। তুলনামূলকভাবে নতুন এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১৪ মার্চ যাত্রা শুরু করে। এই হাসপাতালে রয়েছে দুই শয্যাবিশিষ্ট ৭২৫টি কক্ষ, ৯০৪টি পলিক্লিনিক, ৮২টি ভিআইপি কক্ষ এবং ৭০০টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। প্রতিদিন ৮ হাজারেরও বেশি রোগীকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয় এখানে। এ ছাড়াও, হাসপাতালটিতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে রোগী পরিবহনের সুবিধা রয়েছে, যা দ্রুত ও জরুরি সেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যাপক পরিষেবার মাধ্যমে আঙ্কারা বিলকেন্ত সিটি হাসপাতাল তুরস্কের স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৬. ন্যাশনাল হসপিটাল অব শ্রীলঙ্কা (শ্রীলঙ্কা)
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল হলো ‘ন্যাশনাল হসপিটাল অব শ্রীলঙ্কা’। রাজধানী কলম্বোয় ৩৬ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা ৩ হাজার ৪০৪টি। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী হাসপাতাল, যার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৮৬৪ সালে ‘জেনারেল হাসপাতাল’ হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়।
এই হাসপাতালে ২১টি অস্ত্রোপচার কক্ষ এবং ১৮টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রয়েছে। প্রতিবছর এখানে ২০ লাখেরও বেশি রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এ ছাড়াও, প্রতি মাসে গড়ে ৫ হাজারের বেশি ছোট-বড় অস্ত্রোপচার করা হয়, যা হাসপাতালটিকে সার্জারি ও জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
ন্যাশনাল হসপিটাল অব শ্রীলঙ্কা শুধু চিকিৎসাসেবাই প্রদান করে না, বরং এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করে চলেছে। এর ব্যাপক পরিষেবা এবং ঐতিহ্য এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৭. ক্রিস হানি বারাগওয়ানাথ হাসপাতাল (দক্ষিণ আফ্রিকা)
দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, পুরো আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল এটি। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ শহরের দক্ষিণাঞ্চলীয় সোয়েতো এলাকায়, ১৭০ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ক্রিস হানি বারাগওয়ানাথ হাসপাতাল। এই বিশাল হাসপাতালটি এককভাবে ধারণ করে ৩,২০০ শয্যা, যা এটিকে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৮. কাসের এল আয়নি হাসপাতাল (মিসর)
বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের তালিকায় আট নম্বরে অবস্থান করছে কাসের এল আয়নি হাসপাতাল। মিসরের রাজধানী কায়রোয় অবস্থিত এই হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা ৩,২০০। শুধুমাত্র চিকিৎসাসেবা নয়, এটি গবেষণা এবং প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঐতিহ্যবাহী কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যা হাসপাতালটির একাডেমিক অগ্রগতি ও মান নিশ্চিত করে। হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে মিসরের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যা এর কার্যক্রমের সুষ্ঠু ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে।
৯. ক্লিনিক্যাল সেন্টার অব সার্বিয়া (সার্বিয়া)
‘ক্লিনিক্যাল সেন্টার অব সার্বিয়া’ হলো ইউরোপের দেশ সার্বিয়ার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের তালিকায় ৯ নম্বরে স্থান পায়। এটি দেশটির রাজধানী বেলগ্রেডে ৩৪ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত। হাসপাতালটিতে শয্যার সংখ্যা ৩,১৫০টি, এবং প্রতিবছর ১০ লাখেরও বেশি রোগী এখানে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। এক বছরে ৭,০০০ এরও বেশি নবজাতক এখানে জন্মগ্রহণ করে, আর প্রায় ৫০,০০০ অস্ত্রোপচারও সম্পন্ন হয়। এর বিশাল পরিসর এবং অসাধারণ চিকিৎসা সেবার জন্য এটি সার্বিয়ার স্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
১০. গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কোরিকড় (ভারত)
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার একটি প্রখ্যাত সরকারি হাসপাতাল হলো গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজ, কোরিকড়। এটি শুধুমাত্র ভারতের বৃহত্তম হাসপাতাল নয়, বরং বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের তালিকায় ১০ নম্বরে রয়েছে। কেরালার কোরিকড় শহরের কেন্দ্র থেকে ৮ কিলোমিটার পূর্বে হাসপাতালটির অবস্থান। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই হাসপাতালটি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সেবা প্রদান করে আসছে। এটি ভারতের অন্যতম প্রধান মেডিকেল কলেজ হিসেবে খ্যাত, যেখানে শয্যাসংখ্যা ৩,২৫০।
সূত্র: প্রথম আলো
খবরওয়ালা/আরডি