খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘পারস্পরিক শুল্ক’ (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) নীতি চালু করা। এই নীতির আওতায় এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের পণ্যের উপর সেই দেশের মতোই শুল্ক আরোপ করবে। চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে এই নতুন শুল্ক নীতি কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের। এই নীতি কার্যকর হলে ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্লেষক সংস্থা সিটি রিসার্চ।
সিটি রিসার্চের মতে, ট্রাম্পের এই নীতি কার্যকর হলে ভারতের বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭০০ কোটি ডলার। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ভারতের গাড়ি নির্মাণ শিল্প এবং কৃষি খাত। এছাড়া রাসায়নিক দ্রব্য, ধাতব পণ্য, অলংকার, ওষুধ এবং খাদ্যপণ্য রফতানিতেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ভারত ৭,৪০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। এর মধ্যে মুক্তা, রত্ন এবং গয়না শিল্পের পণ্য রফতানির পরিমাণ ছিল ৮৫০ কোটি ডলার। এছাড়া ওষুধ শিল্প থেকে ৮০০ কোটি ডলার এবং পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য থেকে ৪০০ কোটি ডলারের রফতানি হয়েছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর ভারত গড়ে ১১ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, যা মার্কিন শুল্কের চেয়ে ৮.২ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত ৪,২০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে কারুশিল্প ও যন্ত্রপাতির উপর ৭ শতাংশ, জুতা ও পরিবহন সরঞ্জামের উপর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্যের উপর ৬৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এসব পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতির প্রভাবে ভারতের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিটি রিসার্চের বিশ্লেষকদের মতে, কৃষিপণ্যের উপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করা হলে ভারতের ক্ষতিই বেশি হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের কৃষিপণ্যের রফতানি তুলনামূলকভাবে কম। এদিকে, কম শুল্ক-পার্থক্যের কারণে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যে কাপড়, চামড়া এবং কারুশিল্পজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর যুক্তরাষ্ট্র যদি ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, তাহলে ভারতের অর্থনীতি ৫০ থেকে ৬০ বেসিস পয়েন্ট ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি ১১ থেকে ১২ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত সরকার ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আমদানি করা কিছু পণ্যের শুল্ক হ্রাস করেছেন। এর মধ্যে দামি মোটরবাইকের শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ এবং বোরবন হুইস্কির শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০০ শতাংশ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে ভারত আগামী দিনে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষমতায় ফিরেই তিনি কানাডা ও মেক্সিকোর উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এছাড়া চীনের উপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক এবং ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন। তবে মেক্সিকো ও কানাডার অনুরোধে সাময়িকভাবে তাদের ক্ষেত্রে শুল্ক স্থগিত রেখেছেন ট্রাম্প।
গত ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। তার সফরের ঠিক আগেই ট্রাম্প ‘পারস্পরিক শুল্ক’ নীতি ঘোষণা করেন। ট্রাম্পের দাবি, এই নীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। তবে এই নীতি কার্যকর হলে ভারতসহ অন্যান্য দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনও অনিশ্চিত।
সূত্র: ইকোনমিক টাইমস, রয়টার্স, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস
খবরওয়ালা/আরডি