খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম পেসমেকার তৈরি করেছেন মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ ওয়েস্টার্নের বিজ্ঞানীরা। যার আকার চালের চেয়েও ছোট। আকৃতিতে এতো ছোট ও তারহীন হওয়ায় এটি প্রতিস্থাপন করতে কোনো ধরণের অস্ত্রোপচারও লাগবে না বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োইলেকট্রনিকস বিশেষজ্ঞ এবং পেসমেকারটির এক উদ্ভাবক জন এ রজার্স এক্স হ্যান্ডলে এক পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যা তৈরি করেছি, তা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে ছোট পেসমেকার।’ এটি বিশেষ করে নবজাতকদের জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বলেন, ‘এটি সব ধরনের হৃৎপিণ্ডেই কাজ করতে পারে। কিন্তু এটি তৈরির সময় আমরা মূলত জন্মগতভাবে হৃদ্রোগে আক্রান্ত নবজাতকের কথা মাথায় রেখেছিলাম। শিশুদের হৃৎপিণ্ড অত্যন্ত ছোট ও নমনীয় হওয়ায় সেখানে ছোট আকারের পেসমেকার খুবই জরুরি।’
পেসমেকারটির প্রস্থ মাত্র ১ দশমিক ৮ মিলিমিটার, দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৫ মিলিমিটার এবং মাত্র ১ মিলিমিটার পুরু।
অর্থাৎ এক্ষেত্রে কোনো অস্ত্রপোচারের প্রয়োজন নেই। পেসমেকারটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে প্রয়োজন না হলে শরীরেই দ্রবীভূত হয়ে যেতে পারে। ফলে পেসমেকার বের করার জন্য রোগীকে আবার অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হতে হবে না।
বাজারে বর্তমানে যেসব পেসমেকার প্রচলিত, সেগুলো হৃদপিণ্ডে প্রতিস্থাপনের জন্য অস্ত্রোপচার বা সার্জারি প্রয়োজন হয়।
কোনো কারণে যদি পেসমেকারের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তাহলে শরীর থেকে বের করার জন্যও অস্ত্রপোচার বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের ওপর পরীক্ষা করার এখনও কয়েক বছর বাকি থাকলেও, ওয়্যারলেস বা তারহীন নতুন এই পেসমেকার একটি ‘রূপান্তরকারী অগ্রগতি’ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। এই আবিষ্কার চিকিৎসার অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য উৎসাহিত করতে পারে।
পেসমেকার বৈদ্যুতিক স্পন্দনের মাধ্যমে হৃদস্পন্দনকে উদ্দীপিত করে, ফলে রোগীর হৃদপিণ্ড স্বাভাবিকভাবে স্পন্দিত হয়। আমাদের হৃদপিণ্ড স্বাভাবিকভাবে প্রতি মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার স্পন্দিত হয়। এই স্বাভাবিক গতি না থাকলে গুরুতর অসুস্থ এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে মানুষের। যাদের স্পন্দনজনিত সমস্যা রয়েছে, তাদের হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণ স্বাভাবিক রাখতে পেসমেকার ব্যবহার করা হয়। নতুন যন্ত্রটির পিছনে থাকা মার্কিন নেতৃত্বাধীন গবেষকদের দল জানিয়েছে, তারা জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত এক শতাংশ শিশুকে সাহায্য করতে চায়।
পেসমেকার প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদস্পন্দন থেকে সেরে ওঠার সময় স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধার করতেও সাহায্য করতে পারে। বর্তমানে অস্থায়ী পেসমেকার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বসানো হয় এবং রোগীর বুকে একটি ডিভাইসের সঙ্গে তার সংযুক্ত থাকে। যখন পেসমেকার আর প্রয়োজন হয় না, তখন ডাক্তার বা নার্সরা তারগুলো টেনে বের করে দেয়, যা কখনও কখনও ক্ষতির কারণ হতে পারে। ২০১২ সালে চাঁদে হেঁটে আসা প্রথম ব্যক্তি নীল আর্মস্ট্রংয়ের অস্থায়ী পেসমেকার অপসারণের পর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে তিনি মারা যান।
অন্যদিকে নেচার জার্নালে যন্ত্রটির বর্ণনা দেওয়া একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, পেসমেকারটি রোগীর বুকে পরা একটি নরম প্যাচের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। যখন প্যাচটি অনিয়মিত হৃদস্পন্দন সনাক্ত করবে তখন এটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো জ্বলবে এবং পেসমেকারকে নির্দেশ দিবে হৃদস্পন্দনকে উদ্দীপিত করতে।
পেসমেকারটি একটি গ্যালভানিক কোষ দ্বারা চালিত হয়। এটি শরীরের তরল পদার্থ ব্যবহার করে রাসায়নিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক পালসে রূপান্তর করে হৃদপিণ্ডকে উদ্দীপিত করবে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে শরীরেই দ্রবীভূত হয়ে যেতে পারবে পেসমেকারটি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র গবেষণা লেখক জন রজার্স এএফপিকে বলেছেন, ‘আমাদের আশা, এটি চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।’
গবেষণা অনুসারে, এখন পর্যন্ত, ল্যাবে ইঁদুর, শূকর, কুকুর এবং মানুষের হৃদপিণ্ডের টিস্যুর ওপর চালানো পরীক্ষায় নতুন পেসমেকারটি কার্যকরভাবে কাজ করেছে। রজার্স ধারণা করছেন পেসমেকারটি দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে মানুষের ওপর পরীক্ষা করা যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তার ল্যাব একটি স্টার্ট-আপ চালু করেছে।
সূত্র : এএফপি
খবরওয়ালা/টিএ