খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 28শে চৈত্র ১৪৩১ | ১১ই এপ্রিল ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি। ইতিমধ্যে সাত কলেজের সমন্বয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে, সেটির নাম প্রস্তাব করেছে ইউজিসি। পাশাপাশি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল ও লোগো তৈরির কাজও প্রায় শেষ।
বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, চলতি এপ্রিলের মধ্যে সাত কলেজ পরিচালনায় অন্তর্বর্তী প্রশাসন ঘোষণা করা হবে। এখন অপেক্ষা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাত কলেজের আনুষ্ঠানিক অধিভুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শেষ করা। একই সঙ্গে ঢাবি সাত কলেজ পরিচালনায় অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনও দেবে। ঢাবির অনুমোদনের বাইরে অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠনের যে কার্যক্রম, তার প্রায় সব ধরনের কাজ শেষ হয়েছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর কার্যক্রম চালু হওয়ার আগপর্যন্ত এ প্রশাসনের কার্যকারিতা সচল থাকবে। এই প্রশাসনকে তত্ত্বাবধান করবে ইউজিসি।
সদস্যরা জানান, চলতি শিক্ষাবর্ষের (২০২৪-২৫) ভর্তি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হবে এই প্রশাসনের অধীনে। অন্তর্বর্তী প্রশাসন ঘোষণা হলে ঢাবির অধীনে স্থগিত হওয়া সাত কলেজের ভর্তির আবেদন আবার শুরু হবে। বিগত বছরগুলোর মতোই হবে এবারের ভর্তি পরীক্ষা। নবীন এসব শিক্ষার্থীরা সাত কলেজের বিগত বছরগুলোর সিলেবাসে তাদের পাঠদান শুরু করবেন। এই প্রশাসনের সঙ্গে ভর্তি কার্যক্রমে কারিগরি সহায়তা দেবে বুয়েট। তবে এখানে ঢাবির সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তারাও থাকবেন। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের পর মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ঘোষণা করা হবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল ও লোগো। এই মডেল ও লোগো চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন। ঈদ-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী প্রশাসন, মডেল ও লোগোসহ সব কাজ সমানতালে এগিয়ে চলেছে।
ইউজিসির সচিব ড. ফখরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াসকে সাত কলেজের ‘অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রধান’ হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। সবগুলো কলেজের অধ্যক্ষদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার মাধ্যমে তাঁকে নির্বাচন করা হয়। এ নিয়োগে অধ্যক্ষদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসন পরিচালনার দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অধ্যক্ষদের এসব গুণাগুণ বিবেচনায় অন্তর্বর্তী প্রশাসন পরিচালনায় ঢাকা কলেজ অধ্যক্ষকে কমিশনের কাছে যোগ্য বলে মনে হয়েছে।
এদিকে, সম্প্রতি একাধিক সংবাদমাধ্যমে অধ্যাপক ইলিয়াসকে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রশাসক’ হিসেবে উল্লেখ করে সংবাদ পরিবেশনের বিষয়টি ইউজিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কমিশনের সদস্যরা এটাকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের ঘোষণা অনুযায়ী, যেই কলেজ থেকে প্রশাসক নিয়োগ হবে, সেই কলেজই হবে নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হেডকোয়ার্টার বা সদর দপ্তর। সে হিসেবে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস হচ্ছে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির হেডকোয়ার্টার।
২০১৭ সালে রাজধানীর সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। অধিভুক্তির পর থেকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে দেখা যায় এসব কলেজের শিক্ষার্থীদের। সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে সে আন্দোলন স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়। সাতটি কলেজ হলো–ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এসব কলেজে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী রয়েছেন।
কেমন হবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল
কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কার্যক্রমের পরিকল্পনা করা হচ্ছে কলেজগুলোর ঐতিহ্যকে ধারণ করেই। সাত কলেজের যে পাঁচটিতে ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষার্থী ছিল, সেটি তেমনই থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু কলেজের সময় ও জায়গা শেয়ার করবে। এতে ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষার্থী ও উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষকদের অবস্থান একই থাকবে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি হবে নতুন মডেলের বিশ্ববিদ্যালয়। যে মডেল তৈরিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একাধিক শিক্ষক কাজ করছেন। মডেল তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে। কাজ শেষ হলে এ মডেল নতুন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল (সি আর) আবরারের সঙ্গে বসে চূড়ান্ত করা হবে।
যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের (এনইউএস) মতো হবে সাত কলেজের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি চলবে ‘হাইব্রিড মডেলে’। এর নীতিবাক্য হলো, Learning through interdisciplinary knowledge and teaching বা আন্তবিষয়ক জ্ঞান ও পাঠদানের মাধ্যমে শিখন। এখানে ৪০ শতাংশ ক্লাস হবে অনলাইনে, আর ৬০ শতাংশ ক্লাস হবে সশরীরে। নতুন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনকার মতো একেকটি কলেজে সব বিষয় পড়াশোনা হবে না। এক বা একাধিক কলেজে অনুষদভিত্তিক ক্লাস হবে। যেমন সরকারি তিতুমীর কলেজে হতে পারে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোর ক্লাস। এভাবে অন্যান্য কলেজে হতে পারে অন্যান্য অনুষদভুক্ত বিষয়ের ক্লাস।
প্রাথমিকভাবে ৪টি ডিসিপ্লিন নিয়ে শুরু হচ্ছে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। পরবর্তীতে সক্ষমতা অনুযায়ী ডিসিপ্লিনের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। চারটি ডিসিপ্লিন হলো: সায়েন্স, আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স, বিজনেস স্টাডিস এবং ল অ্যান্ড জাস্টিস। এর মধ্যে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে থাকবে সায়েন্স ডিসিপ্লিন। সরকারি তিতুমীর কলেজে বিজনেস স্টাডিস ডিসিপ্লিন, বাঙলা কলেজে আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স ডিসিপ্লিন এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে থাকবে ল অ্যান্ড জাস্টিস ডিসিপ্লিন।
লোগো কেমন হচ্ছে
ইউজিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাত কলেজের জন্য ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নাম প্রস্তাবনার পর লোগো তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক লোগোর ডেমো নেওয়া হয়েছে। এখন এগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। লোগো তৈরিতে সমান গুরুত্ব পাচ্ছে সাতটি কলেজের প্রতিটি কলেজের নাম ও প্রতিকৃতি। এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত বিপ্লব, ইন্টারডিসিপ্লিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিবাক্যসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লোগোতে আধুনিক ও যুগোপযোগী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে।
খবরওয়ালা/এমএজেড