খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ মে ২০২৫
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম প্রতীক, লেখক, শিক্ষক ও ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক জাহানারা ইমাম (৩ মে ১৯২৯ – ২৬ জুন ১৯৯৪) বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সাহসী ও অনন্য নাম।
ব্যক্তি জীবন ছিল বেদনাঘন; কিন্তু সেই বেদনা তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন একটি জাতির গণচেতনায়। একমাত্র সন্তান শহীদ হওয়ার পরও দমে না গিয়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনে। তাঁর আত্মজীবনীধর্মী গ্রন্থ *একাত্তরের দিনগুলি* শুধু একটি মায়ের চোখে যুদ্ধ দেখার দলিলই নয়, বরং তা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের মানবিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটে গভীরতম চিত্র।
জাহানারা ইমামের বড় ছেলে শাফী ইমাম রুমী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে সাহসিকতার সঙ্গে গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে চরম নির্যাতনের মুখে তাঁর মৃত্যু হয়। এই সন্তানের শহিদ হওয়ার মধ্য দিয়ে জাহানারা ইমাম পরিচিত হন ‘শহীদ জননী’ নামে। পরবর্তী সময়ে রুমীর সহযোদ্ধারা তাঁকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে, এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে। লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন এবং ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর যখন জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযমকে দলটির আমির ঘোষণা করা হয়, তখন দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় ১০১ সদস্যবিশিষ্ট *একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, যার আহ্বায়ক ছিলেন জাহানারা ইমাম।
পরে ৭০টি ছাত্র, নারী, শ্রমিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি, যার নেতৃত্বও তিনিই দেন। এই কমিটি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক গণআদালতের আয়োজন করে, যেখানে গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিচার কার্য সম্পাদনের দায়িত্বে ছিলেন ১২ জন বিচারক, যাঁদের মধ্যে প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জাহানারা ইমাম।
তিনি শুধু একজন প্রতিবাদী কণ্ঠই ছিলেন না, ছিলেন একজন শক্তিশালী কলমযোদ্ধা। তাঁর লেখায় যেমন আছে ইতিহাসের তথ্যনিষ্ঠতা, তেমনি আছে মমতাময়ী এক মায়ের অশ্রু। একাত্তরের দিনগুলি ছাড়াও তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আকাশপাতাল, আমার ছেলেরা, অনিরুদ্ধ রাত্রি।
জাহানারা ইমাম ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণেও দমে যায়নি সেই গণআন্দোলন, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি রয়ে গেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক অনুপ্রেরণাদায়ী প্রতীক হিসেবে।