নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ই মে ২০২৫, ১১:১১ এএম
চলতি ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে বিনামূল্যে বিতরণকৃত পাঠ্যবইয়ে ব্যবহৃত নিম্নমানের কাগজের মাধ্যমে প্রায় ৩৫৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে দেশের ১৭টি ছাপাখানার বিরুদ্ধে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সংশ্লিষ্ট ছাপাখানাগুলোর বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শেষে তাদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে। পাশাপাশি তাদের বিল স্থগিত এবং কালো তালিকাভুক্ত করার বিষয়েও ভাবা হচ্ছে বলে এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবি প্রায় ৪০ কোটির বেশি বই সারা দেশে বিতরণ করেছে। তবে বইগুলোর গুণগত মান নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এরই প্রেক্ষিতে এনসিটিবির তত্ত্বাবধানে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা ও দুটি পরিদর্শন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ৩২টি তদন্ত দল দেশের ৬৪ জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠায়। এতে দেখা যায়, প্রায় ৮ কোটির বেশি বই ছাপা হয়েছে নিম্নমানের কাগজে।
দরপত্রে নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাগজের পুরুত্ব, উজ্জ্বলতা ও বার্স্টিং ফ্যাক্টরের কোনোটাই মানা হয়নি। এমনকি সরকারি তদারকির চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব নিম্নমানের বই মূলত মফস্বল এলাকায় পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তদন্তে উঠে আসে, পাঠ্যবই ছাপা ও সরবরাহে জড়িত ‘ইন্সপেকশন এজেন্ট কোম্পানিগুলোর’ ভূমিকাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ রয়েছে, ছাপাখানার মালিকদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে তারা প্রতিবারই ‘পজিটিভ রিপোর্ট’ দেয়। এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠান তো বিনা পয়সায় ইন্সপেকশন করতে চায়, কারণ পেছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে।”
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১১৫টি ছাপাখানার প্রত্যেকটি ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার কথা থাকলেও প্রতিটি ইন্সপেকশন কোম্পানির জনবল মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জন, যার অধিকাংশই অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনে নিয়োগ দিয়ে পাঠানো হয় কাগজের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে। এসব ইন্সপেক্টরের থাকা-খাওয়ার খরচ বহন করে ছাপাখানার মালিকরাই—ফলে স্বার্থের সংঘাত থেকেই যায়।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, “সরকারি এত সংস্থা ও তদারকি থাকা সত্ত্বেও নিম্নমানের বই কীভাবে সরবরাহ হয়? বোঝা যাচ্ছে, ‘সর্ষের মধ্যেই ভূত’ আছে।”
নিম্নমানের বই সরবরাহকারী হিসেবে ১৭টি ছাপাখানাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের কাছে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনসিটিবির সঙ্গে কাজ করা হাইটেক সার্ভে বিডির স্বত্বাধিকারী মো. বিপ্লব। প্রতিষ্ঠানটি মাঠপর্যায় থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব ছাপাখানা নিয়ম না মেনে কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ইন্সপেকশন কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা নিয়েও নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এনসিটিবির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরীর মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
খবরওয়ালা/এমএজেড
মন্তব্য