এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ মে ২০২৫
একটা অপ্রিয় কথা বলি, দয়া করে কেউ মনে নিবেন না। আমাদের শহুরে জীবনে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ব্যাধি গেঁথে গেছে— সেটা হলো “দেখাতে হবে” মনোভাব।
আমরা যেন সবসময়ই “যতটা আছি, তার চেয়ে একটু বেশি” দেখানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। এই প্রতিযোগিতায় হারিয়ে গেছে বাস্তবতা, নিঃশেষ হয়েছে সঞ্চয়ের জ্ঞান।
আজ চোখে পড়ে, শহরের প্রতিটি বিল্ডিংয়ের গায়ে ঝুলছে ‘টু-লেট’ সাইন। আগে এমন একযোগে দেখা যায়নি। মানুষ দলবেঁধে ঢাকা ছাড়ছে— কেউ চাকরি হারিয়ে, কেউ খরচ মেলাতে না পেরে। অথচ প্রতিটি পরিবার যদি সামান্য হিসেব করেও ছয় মাস চলার মতো সঞ্চয় রাখতো, তাহলে এমন পরিস্থিতিতে অন্যের কাছে হাত পাততে হতো না। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতি সহজেই সামাল দেওয়া যেত।
আমাদের জীবনযাপন ছিল অনেকটাই ভাসমান পাতার মতো। ইনকাম যতটুকু, ব্যয় তারও বেশি। সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে উঁচু ফ্ল্যাট, চকচকে টাইলস আর বাহ্যিক আরামেই যেন সুখ খুঁজতাম আমরা। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য ছিল না কোনো সঞ্চয়, নিরাপত্তার ছিল না কোনো ভিত্তি।
৯০ দশকের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো হয়ত অভাবী ছিল, কিন্তু তাদের জীবনে ছিল সংযম, শৃঙ্খলা আর সঞ্চয়ের অভ্যাস। তখনকার মায়েরা আঁচলের গিটে টাকা বেঁধে রাখতেন, চাল-ডালের ড্রামে লুকিয়ে রাখতেন ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। আজ আমরা কার্ডে কিস্তি দিই, অ্যাপে লোন নেই, অথচ পকেটে নগদ টাকা নেই।
আজকের জীবন যেন চলে “দেখানোর জন্য”। পার্সে টাকা নেই, কিন্তু ফেসিয়াল-ম্যানিকিওর না করলেই চলে না। ইনস্টাগ্রামে ছবির জন্য লাখ টাকা খরচ করতেও দ্বিধা নেই, অথচ দুই মাস ইনকাম বন্ধ হলে সংসার টিকিয়ে রাখাই দায়। এটা কষ্টের, দুঃখের।
কোথায় সেই ছাদের আড্ডা? বাদাম ভাঙা? চায়ের কাপে সাহিত্যচর্চা? এখন সম্পর্ক তৈরি হয় ক্যাফেতে বসে খরচের উপর ভিত্তি করে। ভ্যালেন্টাইন, ক্যান্ডেল লাইট ডিনার ছাড়া সম্পর্ক যেন জমেই না। অথচ একসময় প্রেম মানে ছিল দায়িত্ব নেওয়া। এখন প্রেম মানে ‘অপশন’ আর সম্পর্ক মানে ‘ডে সেলিব্রেশন’।
এই শহরের মানুষ যেন অভিনয়ে অভ্যস্ত— সবাই নিজেকে “পাপাস প্রিন্স” বা “মাম্মাস প্রিন্সেস” ভাবতে চায়। বাস্তব জীবনটা আটকে যায় ব্যাংকের ইএমআই, ক্রেডিট কার্ড আর মানসিক চাপের ঘেরাটোপে। যারা মাসে পাঁচ-সাত হাজার টাকা অহেতুক খরচ করে, সেই টাকাই যদি সঞ্চয় করতো, বছরে ৭০ হাজার, দশ বছরে হতো প্রায় ৭ লাখ— যা সংকটকালে অন্তত ছয় মাস নিশ্চিন্তে বাঁচতে সাহায্য করতো।
আজকের পরিবারগুলো একান্নবর্তী থেকে পারমাণবিক পরিবারে রূপ নিয়েছে। আত্মীয়তা ঢিলে, শেকড় বিস্মৃত। অথচ সেই গ্রাম থেকেই তো আজও আসে চাল, মুড়ি, আম, কাঠালের বস্তা— যার মধ্যে থাকে ভালবাসা, নিরাপত্তা আর শেকড়ের টান।
কক্সবাজারে পাঁচতারকা হোটেলে বিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ না করে যদি কেউ গ্রামের বাড়ি গিয়ে মায়ের মুখ দেখে আসতো, ছোটবেলার উঠোনে দাঁড়িয়ে একটু বাতাস খেতো, তাহলে সেটাই হতো মানসিক আরাম। জীবনের প্রাণশক্তি ফিরে পেত।
আগে মানুষ বছরে একবার ঘুরতে যেত, তাও অনেক হিসাব করে। এখন ঘোরার পেছনে ছুটতে হয়, সেটা কিস্তিতে হলেও— যেন ছবি না তুললে জীবনই অসম্পূর্ণ! ফেসবুকে দুইটা ছবি দিতেই হবে!
সত্যি বললে, এখন এই শহরে ‘মধ্যবিত্ত’ বলে কিছু আর চোখে পড়ে না। সবকিছুই কৃত্রিম, বাহ্যিক চাকচিক্যে মোড়া— যার ভিতরে শূন্যতা। করোনার মতো ছোট্ট একটি বিপর্যয়ই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমাদের এই ‘দেখনদারি’ জীবন কতটা ঠুনকো ছিল।
এখনই সময় ভাবার। এখনই সময় নিজেদের প্রশ্ন করার— আমরা কি টিকে থাকার মতো একটি জীবন তৈরি করেছি? নাকি নিছকই দেখানোর জন্য নিজের ভিতটা দুর্বল করেছি?
“যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ”— এই পুরনো প্রবাদটি যেন আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই খারাপ দিনই হয়তো আমাদের নতুন করে শেখাবে— কীভাবে ভালো থাকা যায়। আসুন, এবার অন্তত নিজেকে একটু থামিয়ে, বাস্তবতা বুঝে, সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলে সত্যিকারের জীবনের পথে হাঁটি।
সুখের পাখিটা তখনই ধরা দেবে— যখন আমরা অভিনয় থেকে ফিরে বাস্তবকে আলিঙ্গন করবো।
লেখক- প্রকাশক ও সম্পাদক, খবরওয়ালা