খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 3শে আষাঢ় ১৪৩২ | ১৭ই জুন ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
দেশের ব্যাংক খাত আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের কারণে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে। এক বছরে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি, দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা—যা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য এক ভয়াবহ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৬ গুণ বেশি। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের মার্চ শেষে ঘাটতির পরিমাণ ছিল মাত্র ২৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা।
তিন মাসেই ঘাটতি বেড়েছে ৬৪ হাজার কোটি টাকা
তিন মাস আগের তুলনায়ও পরিস্থিতি ভয়াবহ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ঘাটতি বেড়েছে ৬৪ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক—উভয়েই বিপদে
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে মার্চ শেষে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৩,৯৬৬ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে ছিল ৫৭,৯৬৬ কোটি।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে প্রভিশন ঘাটতি একই সময়ে দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যেখানে ডিসেম্বরে ছিল ৪৮,৮৮৩ কোটি।
তবে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে বিদেশি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো। মার্চ শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন উদ্বৃত্ত রয়েছে ৪৩২ কোটি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ২৪৮ কোটি টাকা।
প্রভিশনের ঘাটতি মানেই ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়ছে
ব্যাংকগুলোকে সাধারণ ও খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। সাধারণ ঋণে ০.৫–৫ শতাংশ, নিম্নমানের খেলাপিতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক খেলাপিতে ৫০ শতাংশ এবং লোকসানখাতীয় খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু ঋণ জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকগুলো এ প্রভিশন পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে শুধু ব্যাংকের মূলধনই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, গোটা অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা: ঋণ কার্যক্রম বন্ধ হওয়া উচিত
অর্থনীতি গবেষক ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম. হেলাল আহম্মেদ জনি বলেন, ‘মন্দ ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যাংক যদি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের ঋণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এভাবে খেলাপি ঋণ বাড়তে দেওয়া কোনো অর্থনীতির জন্য শুভ নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যতদিন ব্যাংকিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে না ওঠে, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেই খেলাপি ঋণ বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। এজন্য রেগুলেটরি সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি জোরদার করতে হবে।’
খেলাপি ঋণও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের (১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি) ২৪.১৩ শতাংশ। তিন মাসে (ডিসেম্বর থেকে মার্চ) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৪ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এক বছরে বেড়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৪০ কোটি টাকা—যা প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৪ সালের মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ‘চেইন প্রভাব’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন বাড়বে, কিন্তু ব্যাংক সেটা পূরণ করতে না পারায় প্রভিশন ঘাটতি হচ্ছে। আর এই ঘাটতির প্রভাব সরাসরি মূলধনে পড়ে। এটা এক ধরনের ‘চেইন রিঅ্যাকশন’।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতকে রক্ষা করতে হলে এখনই কঠোর তদারকি, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণনীতি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে ব্যাংকিং খাতের এই অস্থিতিশীলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেই গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে।
খবরওয়ালা/আরডি