খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে আষাঢ় ১৪৩২ | ২০ই জুন ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
ইরানের পরমাণু কর্মসূচির শীর্ষ বিজ্ঞানীদের হত্যা করতে ‘অপারেশন নার্নিয়া’ নামের গোপন অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি দৈনিক দ্য জেরুজালেম পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, মোসাদের নেতৃত্বে চলা এ অভিযানে একে একে হত্যার শিকার হয়েছেন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু বিজ্ঞানীরা।
গত শুক্রবার শুরু হওয়া আরেক অভিযান ‘রাইজিং লায়ন’-এর অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ নেতারা এবং পরমাণু কর্মসূচিতে যুক্ত প্রধান বিজ্ঞানীদের টার্গেট করে হামলা চালায়। এর মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট ৮২০০-এর ১২০ জন সদস্য এবং বিমানবাহিনীর সমন্বিত দল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের গোপন পরমাণু বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তার কোডনাম ‘নার্নিয়া’। ইসরায়েলের ভাষায়, এই অভিযান বাস্তবের চেয়ে রূপকথার গল্পের মতোই অবিশ্বাস্য ছিল।
নিহত বিজ্ঞানীরা ইরানের পরমাণু প্রকল্পের অভিজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। অনেকে ছিলেন মোহসেন ফাখরিজাদেহর উত্তরসূরি, যিনি ইরানের পরমাণু বোমা প্রকল্পের জনক হিসেবে পরিচিত।
অভিযান শুরুর আগে ইরানিদের বিজ্ঞানীদের ৪টি স্তরে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়—যাদের মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছেন সামরিক দক্ষতায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা এবং যাদের পরিবর্তন করা সবচেয়ে কঠিন এমন ব্যক্তিরা। এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয় ‘হিট লিস্ট’, যেখানে সবচেয়ে বেশি হুমকি হয়ে ওঠা বিজ্ঞানীদের নাম ছিল শীর্ষে।
নিহত শীর্ষ বিজ্ঞানীরা
অভিযানে নিহত ইরানি বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
অভিযানের প্রস্তুতি কীভাবে
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ইউনিট ৮২০০-তে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা ও বিমান বাহিনীর ১২০ জন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে অপারেশনের পরিকল্পনা শুরু হয়। জানুয়ারি মাসে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙার জন্য নতুন কৌশল খুঁজে বের করার তাগিদ ছিল। একপর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা ঘাঁটি ও বিমান ঘাঁটির খোঁজ মেলে। তবে তখনও টার্গেটের সংখ্যা পর্যাপ্ত ছিল না। এজন্য আলাদা আলাদা টিম তৈরি হয়—কেউ বিজ্ঞানী হত্যা, কেউ কমান্ড সেন্টার ও রাডার ধ্বংসের কাজে নিয়োজিত হয়। এর পরই শুরু হয় ‘রাইজিং লায়ন’ অভিযান।
সাইকোলজিকাল ওয়ারফেয়ার: নতুন কৌশল
এই অভিযানের আরেক চমকপ্রদ দিক হলো ইসরায়েলের নতুন কৌশল—মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) পক্ষ থেকে ‘পার্সিয়ান ভাষায়’ একটি বার্তা এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা হয়, যেখানে ইরানি নাগরিকদের মোসাদের সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়।
বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা বুঝতে পারি, আপনি কঠিন অবস্থার মধ্যে আছেন। আমাদের প্রিয়জনেরা যারা এই পরিস্থিতির শিকার, তারাও ইসরায়েলকে বার্তা দিচ্ছে যেন ইরানকে গাজা বা লেবাননের মতো ভাগ্য না ভোগ করতে হয়।’
বার্তার শেষে মোসাদের একটি লিংক শেয়ার করে বলা হয়—ভিপিএন বা এনক্রিপটেড সংযোগ ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মোসাদের এই ‘অপারেশন নার্নিয়া’ কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, এটি ইরানের পরমাণু প্রকল্পে দীর্ঘদিনের দক্ষতাসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের সরিয়ে দেওয়ার কৌশলী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ইসরায়েল একদিকে যেমন ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতি থামাতে চায়, অন্যদিকে তেহরানের অভ্যন্তরে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
এ অভিযান আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট
খবরওয়ালা/এন