খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ জুন ২০২৫
৫ আগস্টের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর সংগঠনটি ব্যানার-ফেস্টুনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এই সক্রিয়তার সঙ্গে বাড়ছে সংঘর্ষ এবং সহিংসতার ঘটনাও।
গত ১০ মাসে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিবির সংশ্লিষ্ট অন্তত ১৬টি বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছে অন্তত ৬৯ জন শিক্ষার্থী। আহতদের মধ্যে ২৫ জন শিবিরকর্মী এবং বাকি ৪৪ জন ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বামপন্থী সংগঠনের সদস্য ও সাধারণ শিক্ষার্থী।
তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষগুলোর বেশির ভাগ ঘটেছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নোয়াখালী, সিলেট, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট এবং ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কেন্দ্রীয় ইস্যু ছিল ক্যাম্পাসে আধিপত্য, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রচেষ্টা।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রদলকর্মীদের ওপর ছুরিকাঘাতসহ হামলার অভিযোগ ওঠে শিবিরের বিরুদ্ধে। এছাড়াও চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। নোয়াখালীতে ছাত্রদলের এক নেতা গুলিবিদ্ধ হন পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে, যেখানে অভিযোগের তীর ছিল শিবিরের দিকেই।
শুধু ছাত্রসংগঠন নয়, পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগও এসেছে। সিলেটের বিয়ানীবাজারে দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়ে পাঁচ ঘণ্টা জিম্মি ছিলেন। চট্টগ্রামে এক দ্বৈত খুনের ঘটনায়ও শিবিরের এক নেতার নাম উঠে আসে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, শিবির একটি আদর্শনিষ্ঠ ও নৈতিক ছাত্রসংগঠন। সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ বলেন, “যদি কেউ সংগঠনের নামে এমন কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকে এবং তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যায়, আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব অভিযোগ প্রমাণহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে যেসব মহল অভিযোগ তোলে, তাদের হাতেই গত ১০ মাসে খুন হয়েছে ১২৬ জন মানুষ—যাদের বেশিরভাগই তাদের দলের কর্মী। পক্ষান্তরে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে দলীয় কোন্দলে কেউ আহত হয়েছে এমন একটি ঘটনাও কেউ দেখাতে পারবে না।”
চট্টগ্রামের একটি ঘটনায় ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম সংবাদে প্রকাশ হলেও তার কোনো সাংগঠনিক সংযুক্তি নেই বলে দাবি করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের আদর্শ ও কর্মসূচি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।” তিনি মনে করেন, সহশিক্ষা, গণতন্ত্রচর্চা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার সংরক্ষায় ছাত্র সংগঠনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচন প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে এবং সংগঠনগুলোর আদর্শিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করবে।”
জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই শিবির সরাসরি নিজেদের ব্যানারে সক্রিয় না থাকায় সংঘর্ষের দায় নির্ধারণে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদেও শিবিরের নাম জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করছে সংগঠনটি।
আজিজুর রহমান আজাদ বলেন, “আমরা চাই যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে ছাত্ররাজনীতি চর্চা হোক। সহিংসতা নয়, শান্তিপূর্ণ, আদর্শিক ও দায়িত্বশীল ছাত্রসমাজ গঠনের লক্ষ্যেই ছাত্রশিবির নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।”
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাপ্রবাহ ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট নিরসনে কেবল বক্তব্য নয়—সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
খবরওয়ালা/এমএজেড