খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 23শে আষাঢ় ১৪৩২ | ৭ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
গত বছরের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় নিহতদের ‘শহীদ’ ঘোষণা করে প্রকাশিত সরকারিভাবে ঘোষিত গেজেট নিয়ে ঘনীভূত হচ্ছে বিতর্ক। সরকার ঘোষিত ৮৩৪ জনের এই ‘শহীদ গেজেট’ ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, সেখানে অনেকের মৃত্যু তথাকথিত আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি দমন-পীড়নের শিকার হয়ে নয়, বরং আন্দোলনকারী বা দুষ্কৃতিকারীদের কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, গণপিটুনি এমনকি দুর্ঘটনার কারণে ঘটেছে।
‘শহীদ গেজেট’-এর ১৫৭ ও ৮২৭ নম্বরে থাকা সাইদুল ইসলাম ইয়াছিন ও সাইফ আরাফাত শরীফ—দু’জনই যাত্রাবাড়ী এলাকায় তৎকালীন এনসিপির স্থানীয় নেতা রাকিব হোসেনের নির্দেশে তথাকথিত ‘ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে’ ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা ১৩ আগস্ট একটি আবাসিক হোটেলে দম্পতির ওপর হয়রানির নামে চাঁদাবাজি করে এবং নারীটিকে ধর্ষণ করে। খবর পেয়ে আন্দোলনকারীদেরই একটি অংশ তাদের আটক করে এবং পিটিয়ে হত্যা করে। তারপরও এই দুজনকেই সরকারিভাবে ‘শহীদ’ ঘোষণা করা হয়েছে।
১৭৯ নম্বরে তালিকাভুক্ত ডেমরার যুবদল নেতা আবু সাঈদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল এবং ৫ আগস্টের পর তিনি পুনরায় এলাকায় চাঁদাবাজি শুরু করেন। ৯ আগস্ট স্থানীয় জনগণের গণপিটুনিতে তিনি মারা যান। সেই মৃত্যুকেও ‘শহীদ’ হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১৩ আগস্ট একই ধরনের অভিযোগে সায়েদাবাদে আবাসিক হোটেল রোজ ভিউ’র ব্যবস্থাপক রাহাত হাসান বিপুকেও গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। যদিও তার নাম শহীদ গেজেটে নেই, তবে আলোচিত ধর্ষণ মামলার প্রেক্ষাপট তার নামকেও সংযুক্ত করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ৫ আগষ্ট এবং এই হত্যাকান্ড ঘটে ১৪ই আগষ্ট। তারপরও এই ঘটনায় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ ১৩ জনকে আসামি করে ২রা সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলা দায়ের করে নিহত সাইদুল ইসলাম ইয়াছিন এর মা শিল্পী আক্তার এবং
৭৯৭ নম্বরে থাকা যশোর সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদের মৃত্যু হয় ৫ আগস্ট রাতে, বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। হাসপাতালের মৃত্যুসনদে লেখা আছে: “ফেইলুর ডিউ টু সার্ডেন কার্ডিয়াক ডেথ, স্মোক ইনহেলেশন”। অথচ তাকেও ‘শহীদ’ ঘোষণা করা হয়েছে।
৩৭৪ নম্বরে থাকা রবিউল ইসলাম লিমন নিজ এলাকায় তথাকথিত বিজয় মিছিলে অংশ নিয়েও উন্মত্ত মবের হাতে ভুল পরিচয়ে গণপিটুনিতে নিহত হন। মব তাকে ‘পুলিশ কর্মকর্তা’ বা ‘ছাত্রলীগ ক্যাডার’ ভেবে গাছের সঙ্গে উল্টো ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। তারপরও তাকে শহীদ ঘোষণা করা হয়েছে। গেজেটে তার নাম, বাবার নাম, ঠিকানা বা পূর্ণ পরিচয়ও দেওয়া হয়নি—যাতে যাচাই করা কঠিন হয়।
সরকারি গেজেটে যে ৮৩৪ জনের নাম রয়েছে, তার মধ্যে কারও মৃত্যুর তারিখ, স্থান, কারণ, পেশা, বয়স—কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি বহু স্থানে বানান ভুল, ঠিকানার অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যায়। ফলে প্রকৃত তথ্য যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এ তালিকায় গড়মিল করা হয়েছে, যাতে শহীদের সংখ্যা ‘দীর্ঘ’ দেখিয়ে একটি আদর্শিক বৈধতা তৈরি করা যায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো—এমন ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় নিহতদের পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের ‘শহীদ’ প্রমাণ করতে গিয়ে ২ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, শামীম ওসমান, নজরুল ইসলাম বাবুসহ ৩৩৯ জন আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।
খবরওয়ালা/এমএজেড