খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন ‘মব’কে শুধুই জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের আলোচনায় তিনি বলেন, ‘মব’ একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, যা দুর্বৃত্তায়নের সুযোগ বলে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সেটিকে কেবল কিছু মানুষের জটলা বলেও অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।
তার ভাষায়, সাধারণত ‘মব’ বলতে বোঝায় আইনের বাইরে গিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে কাউকে হেনস্তা করা বা ভীতি প্রদর্শন করা। এখানে আসল বিষয় হলো এর পেছনে থাকা উদ্দেশ্য, যা এক ধরনের রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার ও বিভিন্ন পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস সত্ত্বেও কেন এই মব থামছে না?
তিনি বলেন, সরকার যখন ‘মব’কে একটি প্রেসার গ্রুপ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন তা আসলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে। সেইসঙ্গে এটাও স্পষ্ট হয় যে সরকার তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ।
সরকারের উপদেষ্টা ও সেনাবাহিনীর বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেন, তারা বলছেন ‘কেউই মব চায় না’ এবং মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাহলে প্রশ্ন হলো, মব চায় কে? কে এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে? মব যেভাবে অব্যাহত রয়েছে, তা থেকেই বোঝা যায়—কারও না কারও মৌন সম্মতি ও সক্রিয় মদদ রয়েছে।
জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর লক্ষ্য ছিল সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করা, ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করা নয়। যে প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি, সেগুলোকেই কর্মক্ষম করে তোলাই ছিল উদ্দেশ্য। তখনকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে উঠেছিলেন বলে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন—বর্তমান সিইসিও কি একই পথে হাঁটছেন? তার মতে, বর্তমান সিইসি সরকার যা বলছে তাই কার্যত ‘উৎপাদন’ করছেন। ভবিষ্যতে যদি তার বিরুদ্ধেও জনরোষ সৃষ্টি হয়, তখনও কি তাকে বৈধতা দেওয়া হবে? তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, এরকম সহিংসতাকে কোনোভাবেই বৈধ বলা যাবে না।
ড. নাসরীন সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেন, ভিকটিম ব্লেমিং-এর সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে। তিনি সরাসরি বলেন, ‘সহিংসতা বৈধ করার কোনো কারণ নেই, খোঁজাও যাবে না।’ সরকারের নীরবতা ও জবাবদিহিতার অভাবে যারা মব গঠন করে, তারা বুঝে যায় যে তাদের কার্যক্রমে একধরনের মৌন সম্মতি রয়েছে। এমনকি অনেক সময় সরকার নিজের কাজও ‘মব’ দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। যেসব ‘মব’ আওয়াজ তুলছে বা আন্দোলন করছে, সেগুলোকেই কখনও বলা হচ্ছে ছাত্ররা করছে, আবার কখনও বলা হচ্ছে অমুক গোষ্ঠী করছে। সরকার কোন দাবি আমলে নিচ্ছে আর কোনটি নিচ্ছে না, তার মধ্যেই দৃশ্যমান হচ্ছে ‘মবের রাজনীতি’।
সরকারের জবাবদিহিতার অভাবের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এখনো পর্যন্ত সরকার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কেন তারা ‘মব’ থামাতে ব্যর্থ।
পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিগত সরকার পুলিশকে বিরোধী দল ও মত নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এখন পুলিশ নিজের মতো কাজ করতে পারছে না। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তি দিয়ে—যা বলে দেওয়া হয়েছে যে পুলিশ হত্যার কোনো বিচার হবে না। এর ফলে পুলিশের মধ্যে ব্যাপকভাবে হতাশা ছড়িয়েছে। তাদের মনে হচ্ছে, যদি তারা নিহত হয়, রাষ্ট্র কোনো বিচার করবে না—তাহলে কেন জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করবে? এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি সরকারকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন।
খবরওয়ালা/এন